প্রেমের জন্য টিপস নিবেন কার থেকে বন্ধু, নাকি এআই?

প্রেমের প্রস্তাব কীভাবে দেবেন, প্রথম ডেটে কী কথা বলবেন কিংবা পছন্দের মানুষকে কীভাবে আকৃষ্ট করবেন, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একসময় বন্ধুদের পরামর্শই ছিল ভরসা। তবে এখন সেই জায়গা দখল করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। প্রেমের শুরু থেকে সম্পর্কের জটিলতা বোঝা পর্যন্ত নানা বিষয়ে চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছেন অনেকে। ভারতের বিভিন্ন শহরে পরিচালিত জরিপেও উঠে এসেছে ডেটিং ও প্রেমের ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার চিত্র।

ডেটিং অ্যাপ গ্লিডেন ও গবেষণা সংস্থা ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, গত ১২ মাসে দিল্লির ৫৫% উত্তরদাতা কাউকে আকৃষ্ট করার কৌশল উন্নত করতে এআইভিত্তিক কথোপকথন সহকারীর সাহায্য নিয়েছেন। মুম্বাইয়ে এ হার ৪৯%, হায়দরাবাদে ৪৮% এবং বেঙ্গালুরুতে ৪৭%। দেড় হাজারের বেশি মানুষের অংশগ্রহণে পরিচালিত জরিপের এ তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারতের ডেটিং সংস্কৃতিতে এআইয়ের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

আগে প্রেমের বিষয়ে পরামর্শ নিতে মানুষ বন্ধু, কাছের মানুষ কিংবা পরিচিতদের কাছে যেতেন। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে চ্যাটবট। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেমের টিপসের জন্য বন্ধু ভালো, নাকি এআই?

পছন্দের মানুষকে আকৃষ্ট করার কৌশল জানার পাশাপাশি নিজেদের ডেটিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল আকর্ষণীয় করে তুলতেও এআই ব্যবহার করছেন অনেকে। গ্লিডেন ও ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, গত এক বছরে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের ৪৬% উত্তরদাতা নিজেদের প্রোফাইলের বিবরণ উন্নত করতে এআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন। বেঙ্গালুরুতে এ হার ৩৫% এবং হায়দরাবাদে ২৬%।

সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে লিখিত কথোপকথন আরও আকর্ষণীয় করে তুলতেও এআইয়ের ওপর নির্ভর করছেন অনেকে। দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর ৪৬% উত্তরদাতা এ কাজে এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্লিডেন ও ইপসোসের আরেকটি জরিপে দেখা যায়, জীবনের কোনো এক সময়ে কাউকে আকৃষ্ট করার কৌশল উন্নত করতে এআই ব্যবহার করেছেন ৬৫% পুরুষ ও ৬০% নারী। প্রথম ডেটের জন্য জায়গা কিংবা কার্যক্রম বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এআইয়ের পরামর্শ নিচ্ছেন তারা। এ কাজে এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন ৬৪% পুরুষ ও ৬১% নারী।

শুধু প্রেমের শুরু নয়, সম্পর্কের নানা জটিলতা বুঝতেও এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন অনেকে। ডেটিং অ্যাপ আইসলের ৮ হাজার ২৪০ জন শহুরে অবিবাহিত মানুষের ওপর পরিচালিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৫৩.১% নারী নিজেদের অনুভূতি ও সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগের কথা এআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন।

অন্যদিকে, জেনারেশন জেড বা জেন-জি প্রজন্মের ৩৭.৩% মানুষ সম্ভাব্য সঙ্গীর পাঠানো দুর্বোধ্য বার্তার অর্থ বুঝতে এআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন।

এআইয়ের কাছে মনের কথা বলা তুলনামূলক সহজ মনে হতে পারে। কারণ, এখানে তাৎক্ষণিক উত্তর পাওয়া যায়, বিচার বা সমালোচনার মুখে পড়ার আশঙ্কাও কম বলে মনে করেন অনেকে। আইসলের প্রতিবেদনে ২১.৪% উত্তরদাতা এআইয়ের তাৎক্ষণিক প্রাপ্যতাকে এবং ১৮.৩% বিচারহীন পরিবেশকে এর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে এআই ব্যবহারে দ্বৈত মনোভাবও রয়েছে। প্রতিবেদনে ২৪.৩% উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা নিজেরা এআই ব্যবহার করলেও সম্ভাব্য সঙ্গী একই কাজ করলে বিরক্ত বোধ করবেন।

এআইয়ের পরামর্শ নিয়ে মানুষের মনোভাব শহরভেদে আলাদা। আইসলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেঙ্গালুরুর ৫৬% মানুষ মনে করেন, এআই দিয়ে লেখা বার্তা তারা শনাক্ত করতে পারেন। তবে একই শহরের ৮৮% উত্তরদাতার ধারণা, ডেটিংয়ের ক্ষেত্রে এআই দিয়ে তৈরি প্রথম বার্তা এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে উঠবে।

দিল্লি ও আশপাশের অঞ্চলের ৪০.৫% উত্তরদাতার কাছে বাস্তব ডেটের কথোপকথনের তুলনায় এআইয়ের সঙ্গে আলোচনা বেশি অর্থবহ মনে হয়। বিপরীতে, মুম্বাইয়ের ৬৯.১% মানুষ এআইয়ের চেয়ে নিজেদের সহজাত অনুভূতির ওপর বেশি আস্থা রাখেন। পুনের ৪২% উত্তরদাতার মতে, এআইয়ের পরামর্শ তাদের ডেটিংয়ের আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।

অন্যদিকে, হায়দরাবাদের ৫৫% মানুষ সম্পাদনা করা হয়নি এমন স্বাভাবিক প্রোফাইল ছবি পছন্দ করেন। ৪৫.৫% জানিয়েছেন, এআই দিয়ে তৈরি ছবি দেখলে তারা সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেবেন। কলকাতার ডেটিংপ্রত্যাশীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের বিরোধিতা তুলনামূলক বেশি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রেমের টিপস দিতে এআই দ্রুত বার্তা সাজিয়ে দিতে পারে, কথোপকথনের সম্ভাব্য ধরন বুঝিয়ে দিতে পারে কিংবা প্রথম ডেটের পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। কিন্তু মানুষের অনুভূতি, সম্পর্কের প্রেক্ষাপট এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার সব দিক প্রযুক্তির পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত আবেগগত নির্ভরতা নিয়েও সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, এর ফলে কল্পনা ও বাস্তবতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি অবাস্তব প্রত্যাশা, একাকিত্ব, অতিরিক্ত আসক্তি এবং নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বন্ধুরা সাধারণত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট মানুষদের স্বভাব সম্পর্কে ধারণা থেকে পরামর্শ দেন। তবে বন্ধুর পরামর্শও সব সময় নিরপেক্ষ বা সঠিক নাও হতে পারে। অন্যদিকে, এআই দ্রুত নানা বিকল্প তুলে ধরতে পারলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সব সূক্ষ্মতা বুঝতে পারে না। ফলে এআইয়ের পরামর্শকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়ার পরিবর্তে সম্ভাব্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।

সব মিলিয়ে, প্রেমের টিপসের জন্য বন্ধু নাকি এআই, এর উত্তর নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। বার্তা সাজানো, কথোপকথনের অনুশীলন কিংবা ডেটের পরিকল্পনায় এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু নিজের অনুভূতি বোঝা, বিশ্বাস তৈরি করা এবং সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিক আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিকল্প নেই। প্রযুক্তি পরামর্শ দিতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক গড়ে তুলতে শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজস্ব অনুভূতি ও সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।