বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে সাইবার হামলায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এটিকে সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বাইন্যান্স এ হামলার কথা নিশ্চিত করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ব্লকচেইনভিত্তিক তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের দৃঢ় ধারণা, উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট ‘ট্রেডারট্রেইটর’ নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরির ঘটনাতেও একই গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়েছিল।
ক্রিপ্টো খাতের সংবাদমাধ্যম কয়েনডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, আরেক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এলিপটিকও এ হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের দায়ী করেছে।
ধারণা করা হয়, ট্রেডারট্রেইটর গোষ্ঠীটি ‘লাজারাস গ্রুপ’-এর অংশ। ২০১৪ সালে সনি পিকচার্সে সাইবার হামলার অভিযোগ ওঠার পর গোষ্ঠীটি আলোচনায় আসে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ব্যঙ্গ করে নির্মিত ‘দ্য ইন্টারভিউ’ চলচ্চিত্রের প্রতিশোধ নিতে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
দৈনিক লেনদেনের পরিমাণের হিসাবে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা ছিল, একটি ল্যাপটপ হ্যাক করার মাধ্যমেই হামলাকারীরা সিস্টেমে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, হামলাটি ছিল জটিল প্রকৃতির। পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সমস্যার সমাধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে তারা।
লাতিন আমেরিকার জন্য পরিচালিত বাইন্যান্সের এক্স অ্যাকাউন্টে ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ ৬৩০ কোটি ডলার বলে জানানো হয়। এ অঙ্ক বাইবিটে আগের সাইবার হামলায় চুরি হওয়া অর্থের প্রায় চার গুণ।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের সন্ধান ও উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ক্রিপ্টোকারেন্সি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান, ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী সংস্থা এবং খাতসংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চলছে। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে।
শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ সাইবার হামলার ঘটনা খতিয়ে দেখছে।
এফবিআই জানিয়েছে, হামলার ব্যাপ্তি ও প্রকৃতি বুঝতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে তারা। প্রয়োজনে তদন্তে অংশ নিতেও প্রস্তুত রয়েছে সংস্থাটি।
এর আগে বাইন্যান্স এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির একজন ‘ডেভঅপস ইঞ্জিনিয়ার’-এর ব্যবহৃত ল্যাপটপ হ্যাক করে হামলাকারীরা সিস্টেমে প্রবেশ করে। এর ফলে তারা অনুমতি ছাড়াই অর্থ উত্তোলনের লেনদেন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, তাদের ডিজিটাল ওয়ালেটের কোনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা প্রাইভেট কি ফাঁস হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত কারিগরি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
তবে হামলার বিষয়ে বাইন্যান্সের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধিতা দেখা গেছে। একদিকে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, ব্যবহারকারীদের অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ। অন্যদিকে জানিয়েছে, হামলায় হওয়া সব ধরনের ক্ষতি তারা পুষিয়ে দেবে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ইউএসডিটি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথারের প্রধান পাওলো আরদোইনো জানিয়েছেন, বাইন্যান্সে সম্ভাব্য সাইবার হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে তাদের প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম সার্কেলের প্রধান জেরেমি আলেয়ার জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ৮০ কোটি ডলারের বেশি ইউএসডিসি জব্দ করেছে।
ইউএসডিটি ও ইউএসডিসি - দুটিই স্টেবলকয়েন। এসব ডিজিটাল মুদ্রার মূল্য মার্কিন ডলারের মতো প্রচলিত মুদ্রার সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে যুক্ত থাকে। ফলে সাধারণত এগুলোর দামে বড় ধরনের ওঠানামা হয় না।
বাইন্যান্স হামলার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার কয়েক ঘণ্টা আগেই ক্রিপ্টো খাতের পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছিলেন, হ্যাকাররা প্ল্যাটফর্মটিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্টেবলকয়েন ছাড়া অধিকাংশ বড় ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম কমে যায়। তবে স্টেবলকয়েনের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
এ সময় বিটকয়েনের দাম প্রায় ৫% কমে রাতের দিকে ৭৬,৪০০ ডলারে নেমে আসে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের পর এটিই ছিল বিটকয়েনের সর্বনিম্ন দাম। পরে কিছুটা বেড়ে প্রতি বিটকয়েন প্রায় ৭৭,৩০০ ডলারে লেনদেন হয়।
এছাড়া ইথেরিয়ামের দাম প্রায় ৬% এবং বাইন্যান্সের নিজস্ব ক্রিপ্টোকারেন্সি বিএনবির দাম প্রায় ১০% কমে যায়।