Monday, June 15, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দুস্থদের টাকা নিয়ে নিলেন জামায়াত এমপি’র সহকারি, ভাগনে এবং শিবির নেতারা

জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা ৪ হাজার করে টাকা পেলেও প্রকৃত গরিবদের দেওয়া হয়েছে ২ হাজার টাকা করে

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম

ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আসা গরিব ও দুস্থদের জন্য বিশেষ সহায়তার টাকা বিতরণে চরম স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। দুস্থদের বঞ্চিত করে এই টাকা দেওয়া হয়েছে এমপির সহকারি, ভাগনে ও ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতাদের। এমনকি বরাদ্দের পরিমাণের ক্ষেত্রেও সাধারণ গরিবদের সাথে চরম বৈষম্য করা হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার গরিব-দুস্থদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে কয়রা উপজেলার ২০১ জনের একটি তালিকা তৈরি করে ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। সম্পূর্ণ গোপনে এই টাকা বিতরণ করা হলেও সম্প্রতি তালিকাটি জনসমক্ষে আসায় স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর দুস্থ তহবিলের তালিকায় ১ নম্বরেই নাম রয়েছে সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের আপন ভাগনে আহসান হাবিবের। তালিকার ৩ নম্বরে আছেন এমপির ব্যক্তিগত সহকারী আবু ওবাইদা।

দরিদ্রদের এই তালিকায় বাদ যাননি ছাত্রসংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবিরের নেতারাও। তালিকার ৬ নম্বরে রয়েছেন কয়রা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আসমাতুল্যাহ এবং ১০ নম্বরে রয়েছেন কয়রা সদর ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাজহারুল ইসলাম। এছাড়া তালিকায় স্থান পাওয়া অধিকাংশ নামই এলাকার প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তি, যারা সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সাথে যুক্ত।

তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইউনিয়ন শিবিরের সভাপতি মাজহারুল ইসলাম প্রায় ১০ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ করেন এবং পারিবারিকভাবে তারা অত্যন্ত সচ্ছল। একই তালিকায় ১৫২ নম্বরে রয়েছে তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম সরদারের নামও। অপরদিকে, এমপির এপিএস আবু ওবাইদার স্ত্রী একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এবং তাঁদের পরিবার এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে সম্পদশালী হিসেবে পরিচিত।

টাকা বিতরণের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে অভিনব জালিয়াতি। এমপির এপিএস, আত্মীয়স্বজন ও জামায়াত-শিবিরের সচ্ছল নেতাকর্মীরা প্রত্যেকে বরাদ্দ থেকে ৪ হাজার করে টাকা পেলেও প্রকৃত গরিবদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ২ হাজার টাকা করে।

টাকা পাওয়া নাসিমা খাতুন ও রেহেনা পারভীনসহ কয়েকজন ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের উপজেলা পরিষদে ডেকে ২ হাজার করে টাকা দিয়ে বলা হয়েছিল এটি এমপির পক্ষ থেকে ঈদের খরচ। কিন্তু তালিকায় আমাদের নামে ৪ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল এবং বড় লোকেরা ৪ হাজার করেই পেয়েছে শুনে আমরা বিস্মিত ও মর্মাহত।”

তালিকায় নাম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে এমপির সহকারী আবু ওবাইদা সাংবাদিকদের বলেন, “এ তালিকা তো আপনাদের পাওয়ার কথা নয়। তালিকাটি গোপন থাকার কথা ছিল।” তবে ৪ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। ঘটনার বিষয়ে সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সংযোগ পাওয়া যায়নি।

কয়রা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান দাবি করেন, তালিকায় বেশির ভাগই গরিব মানুষ। তবে এপিএসের নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “এটা কীভাবে হয়েছে আমার জানা নেই।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, “ত্রাণ তহবিলের টাকা যাদের পাওয়ার কথা, তাদের বঞ্চিত করে সচ্ছলদের দেওয়া স্পষ্ট অন্যায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে নেতাদের এই স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।”

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী এই বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানান, নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা হতদরিদ্রদের পাওয়ার কথা। তবে উৎসবের বিশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সাধারণত সংসদ সদস্যরা নিজেদের লোক দিয়েই তালিকা প্রস্তুত করিয়ে থাকেন।

   

About

Popular Links

x