Wednesday, September 30, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

চাঁদপুরে দখলদারদের কবলে ডাকাতিয়া নদী, অভিযানে নামছে প্রশাসন

হাইকোর্টের নির্দেশনার পর জরিপ চালিয়ে ডাকাতিয়া নদীর দুই পাড়ের ৭৩৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

চাঁদপুরে ডাকাতিয়া নদীর দুইপাড় অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এক সময়ের খরস্রোতা নদীটি। বহুতল ভবন, দোকানপাট থেকে শুরু করে কলকারখানাসহ নানা অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই।

এতে নদী সংকুচিত হয়ে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক গতিপথ। নাব্যতা হ্রাসে ব্যাহত হচ্ছে পানি প্রবাহ। এ অবস্থায় হাজারো অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ডাকাতিয়া নদীর অস্তিত্ব রক্ষার মিশনে নামছে প্রশাসন।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় ডাকাতিয়া নদী ছিল নৌপথে যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই নদীপথে চলাচল করতো যাত্রীবাহী লঞ্চ। পণ্য পরিবহনে ছিল শত শত নৌকা ও মালবাহী ট্রলার। নদীর দুই পাড়জুড়ে ছিল খোলা পরিবেশ, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আর প্রাণচাঞ্চল্য। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র।

অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর এসব অবৈধ দখল চললেও নদী রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চাঁদপুর শহরের বাসিন্দা জামিলুর রহমান বলেন, “ডাকাতিয়া নদী আগে অনেক প্রশস্ত ছিল। যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করতো। কিন্তু কয়েক দশক ধরে নদীর দুপাড়ে প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছে। এ কারণে নদী এখন সংকুচিত হয়ে গেছে। বিআইডব্লিউটিএ এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেয়নি। কোথাও কোথাও বিআইডব্লিউটিএ এর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই সরকারি জায়গা দখল করছেন প্রভাবশালীরা।”

চাঁদপুর সরকারি কলেজের মাস্টার্সে পড়ুয়া শিক্ষার্থী তানজিম হাসান বলেন, “শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদী একটি চমৎকার নদী। এটি শহরের দুপাড়ের সৌন্দর্য বর্ধনের গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ডাকাতিয়া নদীর পাড় দখল হয়ে যাচ্ছে, চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”

আরেক শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান বলেন, “বিভিন্ন স্থানে নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। দখল-দূষণের কারণে ডাকাতিয়া নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আমরা চাই, নদী দখল দূষণমুক্ত হোক।”

এদিকে, এবার প্রথমবারের মতো ডাকাতিয়া নদীকে দখল মুক্ত করতে বড় ধরনের অভিযানের উদ্যোগ নিয়েছে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ।

হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং জেলা নদী রক্ষা কমিটির সিদ্ধান্তের পর যৌথ জরিপ চালিয়ে বড়স্টেশন থেকে গাছতলা ব্রিজ পর্যন্ত নদীর দুই পাড়ের ৭৩৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম ধাপে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে নদীর দুই পাড়ের দখলমুক্ত জায়গা পুনরুদ্ধার করা গেলে স্বাভাবিক হবে পানিপ্রবাহ, পাশাপাশি নদীর নাব্যতা রক্ষার পথও সুগম হবে। চলতি মাসেই জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সমন্বয়ে ডাকাতিয়া নদীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়টি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযানে কাউকে যেন ছাড় না দেওয়া হয়

স্থানীয় পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও বাবুরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোশারেফ হোসেন বলেন, “উচ্ছেদ অভিযান যাতে লোকদেখানো কার্যক্রমে পরিণত না হয়। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নদী দখলদারদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। একইসঙ্গে ড্রেজিং করে ডাকাতিয়া নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, “যারাই ডাকাতিয়া নদী ও তীর অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে, আমরা প্রশাসনকে বলেছি সবাইকে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে উচ্ছেদ করা হয়। কাউকেই যেন ছাড় দেওয়া না হয়।”

চাঁদপুরে ডাকাতিয়া নদীর পাড় অবৈধভাবে দখল করে তৈরি ভবন

দখল-দূষণ রোধে তৎপর নদী রক্ষা কমিটি, শীঘ্রই অভিযান

ডাকাতিয়া নদী রক্ষায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি নদী দূষণরোধেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে উচ্ছেদের পর আবারও অবৈধ দখল ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএ উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “আদালতের আদেশ ও জেলা নদীর রক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডাকাতিয়া নদীতে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। পৌর এলাকার বড়স্টেশন মোলহেড থেকে গাছতলা পর্যন্ত ৭৩৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় আমরা অচিরেই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করতে পারবো।”

তিনি জানান, ডাকাতিয়ার দিকে তার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে দিতে চাঁদপুর থেকে শাহারাস্তি পর্যন্ত পুরো ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ধাপে ধাপে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

চাঁদপুর জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, “নদী দখল ও দূষণমুক্ত করতে করণীয় সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যে বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে আলোচনা করেছি। অনেক সময় দেখা যায় দখল পুনরুদ্ধার করলেও এগুলো আবারও দখল হয়ে যায়। এবার যাতে সেটা না হয় সেজন্য কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। সীমানা নির্ধারণের পিলারগুলো ঠিক রাখতে হবে এবং নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে।”

তিনি জানান, আমরা এখন হোমওয়ার্ক করছি। এ মাসের মধ্যেই আমরা উচ্ছেদে অভিযানে যাব। দখল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি আমরা চেষ্টা করব নদীর দূষণমুক্ত করতে।

   

About

Popular Links

x