Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ওসির বিরুদ্ধেই যখন মাদক ব্যবসার অভিযোগ

গত ১৫ মে ওসি জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা পরিচালনা, মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা, মাদক মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ লিখিত আকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বরাবর পাঠিয়েছেন রৌমারী উপজেলা চেয়ারম্যান, এ উপজেলাধীন ছয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য। 

আপডেট : ২৭ মে ২০১৮, ০১:২৪ পিএম

দেশব্যাপী চলা মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যে কুড়িগ্রামের রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ছোটখাটো একটা বাহিনী বানিয়ে এর সদস্যদের দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। রৌমারী উপজেলার সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, মাদক ব্যবসা পরিচালনা ছাড়াও স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন ওসি জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া, মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়েও নেনরৌমারী উপজেলা চেয়ারম্যান, এ উপজেলাধীন ছয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য জানান, গত ১৫ মে ওসি জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা পরিচালনা, মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা, মাদক মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ লিখিত আকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বরাবর পাঠিয়েছেন তারা।

লিখিত অভিযোগে তারা উল্লেখ করেছেন, উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের সুজন, লিংকন ও খালেকসহ স্থানীয় কয়েকজন যুবককে নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন ওসি জাহাঙ্গীর আলম। এ বাহিনীই মূলত রৌমারী থেকে রাজিবপুর হয়ে বকসীগঞ্জ থানা পর্যন্ত মাদক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। এ বাহিনীর সদস্যদের সাহায্যে ওসি জাহাঙ্গীর আলম সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে মাদক মামলার ভয় দেখানো ও টাকা হাতানোর কাজটা করেন। যারা টাকা দিতে পারে না তাদের জেলে পুরে দেন তিনি। আর এভাবেই তিনি অনেক লোককে গ্রেফতার দেখাতে পেরেছেন এবং পুরস্কার পেয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত সীমান্তবর্তী রৌমারী উপজেলায় সদর ইউনিয়নের চর ফুলবাড়ী, খাটিয়ামারী, ভন্দুর চর, বড়াইবাড়ি, দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের সাহেবের আলগা, ইটালুকান্দা, খেতার চর, শৌলমারী ইউনিয়নের গয়তাপাড়া সীমান্ত দিয়ে বর্তমানে ইয়াবা, ফেন্সিডিল, অফিসার্সস চয়েজ (মদ) আসে। এসব মাদকদ্রব্য পুলিশের একটি জব্দ করা গাড়িতে করে রৌমারী ছাড়াও জামালপুর ও শেরপুরের বিভিন্ন জায়গায় যায়। পরে সেখান থেকে এসব মাদকদ্রব্য চলে যায় টঙ্গীতে। এসব ক্ষেত্রে পুলিশের জব্দ করা গাড়ি ব্যবহার করা হয় বলে ওসি জাহাঙ্গীর আলম ও তার সহযোগীরা নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালাতে পারেন।

ওসি জাহাঙ্গীর আলম (ছবি- প্রতিনিধি)

এ ব্যাপারে উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মো. সুরুজ্জামাল সরকার বলেন, ‘ওসি জাহাঙ্গীর আলম তার ক্লাসফ্রেন্ড ও স্থানীয় যুবক ইব্রাহিম লিংকনের সঙ্গে মিলে মাদক সেবন ও ব্যবসা করে। মূল ব্যবসায়ী লিংকন গাড়ি (পুলিশের জব্দ করা গাড়ি) দিয়েই মাল (মাদকদ্রব্য) জামালপুরের সানন্দাবাড়ি পৌঁছে দেয়। এসব জেনেশুনেই অভিযোগ দিয়েছি।’

ওসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বঙ্গবাসী বলেন, ‘ওসি জাহাঙ্গীর আলম নিজেই একজন মাদক ব্যবসায়ী। তার ছত্রছায়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মাদক কেনাবেচা করে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই অভিযোগের সত্যতা পাবে।’

এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল ইসলাম মিনু বলেন, ‘আমিও অনেকের কাছে এমন অভিযোগ পেয়েছি। লিংকন মূলত ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। এখন সে যুবলীগের কর্মী পরিচয়ে ওসির ছত্রছায়ায় মাদকের ব্যবসা চালাচ্ছে। তারা মানুষকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে হয়রানি করে বলেও অভিযোগ পেয়েছি।’

ওসির বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ সত্য জানিয়ে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘ওসির হয়রানির ভয়ে স্থানীয় জনগণ এখন আতঙ্কিত। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে সে সাধারণ মানুষদের হয়রানি করবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।’

সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘ওসি মাদক উদ্ধার করে অনেক। কিন্তু সরকারি হিসাবে দেখায় কম। সে উদ্ধার করা মাদক পরে বিক্রি করে।’

অভিযোগ রয়েছে, মাদকের মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে রৌমারীর শৈলমারীর চরের গ্রামের মো. আবু বক্করের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম হায়দারের কাছ থেকে কয়েক দফায় টাকা নিয়েছেন ওসি জাহাঙ্গীর আলম।

এ নিয়ে গত ১০ মে ঢাকায় পুলিশ হেডকোয়ার্টারে উপস্থিত হয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাভেদ পাটোয়ারী বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ক্ষুদে ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম হায়দার। লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, গত বছরের একটি সাজানো ঘটনার জের ধরে এ বছরের ৬ এপ্রিল ওসি জাহাঙ্গীর আলম স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে আটক করেন।পরে শৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান হাবিলের মধ্যস্থতায় সাইফুলকে ছাড়ানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলে থানায় নিয়ে সারারাত তাকে আটকে রাখেন ওসি জাহাঙ্গীর আলম। পরের দিন (৭ এপ্রিল) সকালে সাইফুল ইসলামকে ছাড়াতে তার বড় ভাই ছায়দার আলী, ছদিয়া ও আমিনুল ইসলামের উপস্থিতিতে থানার ক্যাশিয়ার ও ওসি জাহাঙ্গীর আলম দুই লাখ টাকা নেন।হায়দার আরও উল্লেখ করেন, টাকা দেওয়ার কথা প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলারও হুমকি দেন ওসি।

ওসি জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সাইফুল ইসলাম হায়দারের হয়রানির লিখিত অভিযোগ (ছবি- প্রতিনিধি)


শনিবার (২৬ মে) সাইফুল ইসলাম হায়দারকে ফোন দিলে তিনি বলেন, ‘ওসি জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ঢাকা পুলিশ হেডকোয়ার্টারে উপস্থিত হয়ে আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাভেদ পাটোয়ারী বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি আমি। মামলার ভয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে কয়েক দফায় টাকা নিয়েছেন ওসি জাহাঙ্গীর আলম, লিখিত অভিযোগে আমি তা উল্লেখ করেছি।’

এ ব্যাপারে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি সহেলী ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন একটি অভিযোগের কথা শুনেছি। তবে এ বিষয়ে লিখিত আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেকোনও অভিযোগের আবেদনই গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় এবং তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

অভিযোগের ব্যাপারে ইব্রা‌হিম লিংকন বলেন, ‘ওসির মাদকবি‌রোধী অভিযা‌নে স্বার্থহানি ঘটায় ক্ষুদ্ধ হ‌য়ে ক‌য়েকজন এসব অভি‌যোগ দি‌চ্ছে। আমি কোনোভা‌বেইমাদ‌কের সঙ্গে জ‌ড়িত নই। বরং চি‌হ্নিত মাদক ব্যবসায়ী‌দের ধ‌রি‌য়ে দি‌তে আমি পু‌লিশ‌কে সহায়তা ক‌রি।’

ওসি জাহাঙ্গীর আলম ও তি‌নি আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছি‌লেন জা‌নি‌য়ে লিংকন আরও ব‌লেন, ‘আমি কখনই ছাত্রদ‌লের রাজনী‌তির সঙ্গে জ‌ড়িত ছিলাম না। আমি বর্তমা‌নে ঠিকাদা‌রি ব্যবসা ক‌রি।’ এক প্রশ্নের জবা‌বে লিংকন জানান, ‘আমি‌ কখনও ওসির সঙ্গে কোনও অভিযা‌নে যাই‌নি। ওসির মাদকবি‌রোধী অভিযা‌নে যা‌দের স্বার্থহানি হ‌য়ে‌ছে, তারা হয়‌তো কোনোভা‌বে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জ‌ড়িত, তাই তারাই এগু‌লো ছড়া‌চ্ছে।’

অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে রৌমারী থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘তারা কি বললো না বললো তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। তাদের অভিযোগ তদন্ত করা হোক।’

তিনি জানান, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানসহ বিভিন্ন অপরাধ কমিয়ে আনার জন্য তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর পুলিশ সুপার (এসপি) মেহেদুল করিম এই পুরস্কার তার হাতে তুলে দেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ওসি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে, এমপির (স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন) ছেলে মাদক ব্যবসা করে। উপজেলা চেয়ারম্যানও সরাসরি মাদক ব্যবসা করেন। তারা এখন নিজেরা বাঁচতে এসব আবোল-তাবোল কথা বলা শুরু করছে।’

স্থানীয় যুবক লিংকনের সঙ্গে মেলামেশা ও তাকে নিয়ে অভিযানে যাওয়ার ব্যাপারে ওসি বলেন, ‘তার (লিংকনের) ভাই পুলিশের একজন ইন্সপেক্টর, সে সুবাদে তার সঙ্গে মেলামেশা। আর লিংকনের এলাকায় অভিযানে গেলে পথ দেখিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে সঙ্গে নেওয়া হয়, এর পেছনে অন্য কোনও কারণ নেই।’ লিংকনের বিরুদ্ধে রৌমারী থানা বা অন্য কোথাও কোনও অভিযোগ নেইবলেও দাবি করেন ওসি। 

About

Popular Links