• বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৯ রাত

‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত মাদক ব্যবসায়ী লিয়াকত যুবলীগ নেতা

  • প্রকাশিত ০২:৪৭ দুপুর মে ২২, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট ০২:৪৯ দুপুর মে ২২, ২০১৮
‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত মাদক ব্যবসায়ী লিয়াকত যুবলীগ নেতা
মাদক ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী মণ্ডল বাংলা ট্রিবিউন

রাজশাহীর পুঠিয়ায় র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী মণ্ডল (৪১) যুবলীগ নেতা ছিলেন। তিনি পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। রবিবার (২০ মে) গভীর রাতে উপজেলার বেলপুকুর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র জামিরা গ্রামে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিয়াকত নিহত হয়।

র‌্যাবের দাবি, নিহত লিয়াকত এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে একটি নাশকতাসহ মাদক, চাঁদাবাজি, চোরাচালান ও হত্যাচেষ্টার ১১টি মামলা রয়েছে। নিহত লিয়াকত পুঠিয়ার বানেশ্বর ইউনিয়নের নামাজগ্রাম এলাকার বাসিন্দা।

পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমার থানায় তার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা ছিল। এরমধ্যে ৭টি মামলা ছিল মাদকের। একটি নারী নির্যাতন ও একটি অন্য মামলা ছিল। খবর পেয়েছি আমার থানা ছাড়া অন্য থানায় মাদক নিয়ে আরও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।’  

লিয়াকতের বড় ভাই জুবের মণ্ডল জানান, তার ভাই একসময় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। প্রায় ২ বছর আগে সে মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে গরুর খামার করছিল। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তার ভাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে হাত ভেঙে দেয়। সে সময় লিয়াকত রাষ্ট্রবিরোধী কোনও কর্মকাণ্ডে  জড়িত ছিলেন না বলে প্রত্যয়নপত্র দেন পুঠিয়া পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম রবি। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে ছেড়ে দেয়। 

পুঠিয়া উপজেলা যুবলীগ সভাপতি ও পুঠিয়া পৌরসভার মেয়র রবিউল ইসলাম রবির দেওয়া সততার প্রত্যয়নপত্র প্রসঙ্গে মেজর আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সে যদি সৎ মানুষ হতো তাহলে তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা থাকতো না। এই মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে মাদক, নাশকতা, হত্যাচেষ্টা ও চোরাচালানের। তাছাড়া সে যে যুবলীগ নেতা তারও কোনও তথ্য আমরা পাইনি।’

নিহত লিয়াকতের মেয়ে শারমিন আক্তার হাসি বলেন, রবিবার দুপুরে র‌্যাব পরিচয়ে মোমিন আর ফিরোজ নামে  দুজন আমার বাবাকে বাড়ি থেকে গরু কিনে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যায়। দুপুর ১২টা ৪২ মিনিটে বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলাম। তখন বাবা বলেছিল, ‘মা আমি শিবপুরে গরু দেখতে এসেছি।’ এরপর দুপুরে আমার মা আবার কল করলে বাবার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।  

তিনি আরও বলেন, আমার বাবাকে এর আগেও র‌্যাব নিয়ে গিয়েছিল। তখন র‌্যাব বাবাকে নির্যাতন করে। এরপর থেকে আমার বাবা ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারতো না। আমার বাবা তখন থেকে মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছিল।

পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিল উদ্দিন আহমেদ বলেন,  ‘যে একবার মাদকের অর্থ পেয়েছে, সে কি এই পেশা সহজেই ছাড়তে পারে? তার জীবনযাপনও ছিল ব্যয়বহুল। সে যদি মাদকের ব্যবসা ছেড়ে দেয়, তাহলে এতো টাকা কোথায় পেতো।’ এদিকে লিয়াকতের স্ত্রী নেহের বানু বলেন, ‘র‌্যাবের পরিচয় দেওয়া ফিরোজ আর মোমিন গ্রামের কালামের ছেলে বাবু আর রইসের ছেলে শহিদুলকে দিয়ে ফেন্সিডিলের ব্যবসা করাতো। এরা চারজন মিলে আমার স্বামীকে গরু কেনার কথা বলে নিয়ে যায়। স্বামী নিখোঁজের পর পুঠিয়া থানায় জিডিও করেছিলাম। আমি এদের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা করবো।’

পুঠিয়া থানার ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কারও নাম উল্লেখ না করে লিয়াকতের স্ত্রী নেহের বানু বাদী হয়ে রবিবার দুপুরের পর পুঠিয়া থানায় একটি জিডি করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, ‘গরু কিনতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে তার স্বামী লিয়াকত নিখোঁজ হয়েছে।’   

জানা গেছে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি পুঠিয়া উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও পুঠিয়া পৌরসভার মেয়র রবিউল ইসলাম রবি নিহত লিয়াকত রাষ্ট্রবিরোধী কোনও কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না বলে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিলেন। এতে রবি লেখেন, ‘আমি তাকে (লিয়াকত) ব্যক্তিগতভাবে চিনি ও জানি। সে একজন সৎ চরিত্রের পরিশ্রমী ছেলে। আমার জানামতে সে কোনও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত নয়।’

পুঠিয়া উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও পুঠিয়া পৌরসভার মেয়র রবিউল ইসলাম রবি বলেন, ‘ভুল করে সে সময় প্রত্যয়নপত্রটি দিয়েছিলাম। সে সময় আমি খুব ব্যস্তও ছিলাম। যে কারণে যাচাই-বাছাই করতে পারিনি। এমনকি আমি থানার তৎকালীন ওসিকে ফোনও দিয়েছি। ওসি সাহেবও বলেছিলেন তার বিরুদ্ধে থানায় কোনও মামলা নেই। পরে শুনছি সে যুবলীগের কোন পদে নেই, সে একজন মাদক ব্যবসায়ী।’ 

নিহত লিয়াকত সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক কামরুজ্জামান চঞ্চল বলেন, তার সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। রাজশাহী মহানগর পুলিশের বেলপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা বলেন, আমার থানায় তার বিরুদ্ধে কোনও মামলা নেই। আর আমি সাত দিন আগে থানায় যোগ দিয়েছি। এজন্য তার সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। 

র‌্যাব-৫-এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রবিবার রাতে টহল ডিউটি ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করার জন্য রাজশাহী মহানগরীর বেলপুকুর থানা এলাকার উদ্দেশে বের হয় তারা। অভিযান পরিচালনার ধারাবাহিকতায় রাতে রাজশাহী মহানগরীর বেলপুকুর থানাধীন ছোট জামিরা এলাকায় রাস্তার পাশে একটি আমবাগানের ভিতরে টর্চের আলো এবং কিছু লোকের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। এ সময় র‌্যাবের আভিযানিক দল আমবাগানের দিকে গেলে র‌্যাবের উপস্থিতি বুঝতে পেরে কিছু লোক দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলে তারা তাদের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তখন র‌্যাব সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। উভয়পক্ষের মধ্যে প্রায় ৫ মিনিট গুলিবিনিময় হয়। একপর্যায়ে দুষ্কৃতকারীরা গুলি করতে করতে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। র‌্যাব সদস্যরা তখন ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে লিয়াকতকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখতে পায়। এরপর তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে।

পরে র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে ১টি বিদেশি পিস্তল, ১টি ম্যাগাজিন, ২ রাউন্ড গুলি, ১টি গুলির খালি খোসা, ৮২৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১টি মোটরসাইকেল, ১টি টর্চলাইট, ১টি তোয়ালে, দুই জোড়া স্যান্ডেল ও ১টি গ্যাস লাইটার উদ্ধার করে। এ ঘটনায় র‌্যাবের দুজন সদস্য আহত হন। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।