• বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৪২ রাত

পেটের ভেতরে ইয়াবা-স্বর্ণ: চোরাকারবারিদের প্রাণঘাতী কৌশল

  • প্রকাশিত ০৯:৫১ রাত মে ৩০, ২০১৮
yaba-1527695398003.jpg
ইয়াবা পাচারকারী চক্রের আটক চার সদস্য

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিতে পেটের ভেতরে বিশেষ কৌশলে ইয়াবা ও স্বর্ণের বার ঢুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে। কখনও পলিথিনে পেঁচিয়ে মুখ দিয়ে, কখনও বিশেষ কায়দায় পায়ুপথ দিয়ে ইয়াবা-স্বর্ণ ঢোকানো হয় পেটের ভেতর। পরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে তা বের করা হয় মলত্যাগের মাধ্যমে। চোরাকারবারিবা সাধারণ বহনকারীদের অর্থের লোভ দেখিয়ে প্রাণঘাতী এই কৌশলে ইয়াবা ও স্বর্ণ বহনে বাধ্য করাচ্ছে।

তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। পেটের ভেতরে ইয়াবা-স্বর্ণ ঢুকিয়ে বহন করায় যেকোনও সময় মৃত্যু হতে পারে। এরই মধ্যে কয়েকজন মৃত্যুর কোলে ঢলেও পড়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, এটা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ একটা বিষয়। পেটের ভেতরে ইয়াবা-স্বর্ণ ঢোকানো হলে যেকোনও সময় মৃত্যু হতে পারে। বিশেষ করে পলিথিনে পেঁচিয়ে ইয়াবা পেটে ঢোকানো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যেকোনও সময় পলিথিন ফেটে বা লিক হয়ে ইয়াবা পাকস্থলীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর একাধিক স্বর্ণের বার পেটের ভেতরে থাকার কারণে পেটের ভেতরের অর্গানগুলোর স্বাভাবিক পরিচালনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

তিনি বলেন, পেটের ভেতরে ইয়াবা-স্বর্ণ ঢোকালে প্রাথমিকভাবে পেটব্যথার উপসর্গ দেখা যেতে পারে। যদিও চোরাকারবারিবা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এসব আবার বের করে ফেলে। তবে ধারাবাহিকভাবে এই কাজে কেউ লিপ্ত থাকলে তার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে চোরাকারবারিদের মধ্যে পেটের ভেতরে করে ইয়াবা ও স্বর্ণের পাচার দেখা যাচ্ছে। সাধারণত আগে থেকে নিশ্চিত না হওয়া গেলে এ ধরনের চোরাকারবারিদের ধরা যায় না। কারণ, সাধারণভাবে শরীর বা সঙ্গে থাকা লাগেজ তল্লাশি করে অবৈধ মালামাল চেক করা হয়। কিন্তু পেটের ভেতরে থাকা কোনও দ্রব্য সাধারণ তল্লাশি যন্ত্র দিয়েও শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইয়াবার ক্ষেত্রে চোরাকারবারিরা পলিথিনে পেঁচিয়ে টিউবের মতো তৈরি করে থাকে। একেকটি টিউবে ৪০০ থেকে ৫০০ ইয়াবা ট্যাবলেট থাকে। এগুলো কখনও কলার ভেতরে ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে গিলে খাওয়া হয়। আবার কখনও বিশেষ কৌশলে মলদ্বার দিয়ে পেটের ভেতরে ঢোকানো হয়। ৫ থেকে ২০/২৫টি টিউব একসঙ্গে পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে বহনকারীরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাত্রা শুরু করে। পথে তারা তল্লাশির মুখোমুখি হলেও তাদের ধরা যায় না।

গত রবিবার (২৭ মে) বিকালে রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকা থেকে এক শিশুসহ দুই রোহিঙ্গা নাগরিককে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তারা পেটের ভেতরে ইয়াবা ঢুকিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকায় এনেছিল। সেলিম মোল্লা ও ১২ বছর বয়সী তার ভাতিজা আফছার ওরফে বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ২৫ হাজার টাকার লোভে দুই চাচা-ভাতিজা এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর কথায় ৫ হাজার ইয়াবা কক্সবাজার থেকে ঢাকায় এনেছিল। তারা ৫০ পিস করে ইয়াবা ক্যাপসুলের মতো বানিয়ে পলিথিনে মুড়িয়ে গিলে খায়। সেলিম মোল্লা নিজে এরকম ৭০টি ক্যাপসুল খায় এবং আফছারকে ৩০টি ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, এত বেশি ইয়াবা পেটের ভেতরে করে আনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তার মধ্যেই এরকম ইয়াবা বহনকারীদের মৃত্যু হতে পারে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (উত্তর) মহরম আলী জানান, সেলিম মোল্লা ও আফছার জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে, ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও তারা অর্থের লোভে পেটের ভেতরে করে ইয়াবা বহন করেছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আর কারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত তা জানার চেষ্টা চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বছর দেড়েক আগে কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা এলাকার দিলদার মোহাম্মদ ওরফে লালু নামে এক কিশোর টেকনাফ থেকে পেটের ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে ঢাকায় রওনা দিয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার পেটে ব্যথা শুরু হলে সে নিজেই বাস থেকে নেমে যায়। পরে পেটব্যথা চরম আকার ধারণ করলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় সে। ময়নাতদন্তের পর তার পেট থেকে পাঁচ প্যাকেট ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। বাকি ইয়াবাগুলো গলে যায় পেটের মধ্যে। ২০১৬ সালেও পায়ুপথে ইয়াবা বহন করার সময় তা গলে গিয়ে মারা যায় ইসমাইল ওরফে বাঘাইয়া নামে টেকনাফের কচুবনিয়া এলাকার এক তরুণ।

ঢাকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, পেটের ভেতর ইয়াবা বহনের প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। লোভে পড়ে মাদক চোরাকারবারিরা আত্মঘাতী এ কৌশল বেছে নিচ্ছে। কারণ, কক্সবাজার থেকে একটি চালান ঢাকায় আনতে পারলে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পায় বহনকারীরা। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরাও তাদের স্বীকারোক্তিতে বলেছে, অর্থের লোভেই তারা এমন ভয়ঙ্কর কৌশল বেছে নিয়েছে। গত দুই বছরে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০ জন মাদক বহনকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের পেটের ভেতর থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

ঢাকার শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১০টি অভিযানে তারা স্বর্ণ চোরাকারবারিদের আটকের পর পেটের ভেতর থেকে স্বর্ণ উদ্ধার করেছেন। নিশ্চিত তথ্যের মাধ্যমে সন্দেহভাজনকে আটকের পর এক্সরে করার পর চিকিৎসকদের সহায়তায় মলত্যাগের মাধ্যমে এসব স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, পেটের ভেতরে লুকানো জিনিস শনাক্তের জন্য উন্নত দেশগুলোতে বিশেষ যন্ত্র রয়েছে। বাংলাদেশেও এরকম যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।