• বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৫ রাত

প্রবাসে চাকরির স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে রূপান্তর : কে নেবে দায়ভার?

  • প্রকাশিত ০৫:২৩ সন্ধ্যা আগস্ট ২৭, ২০১৮
লিলি ও নবজাতক
লিলি ও তার নবজাতিকা।ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

ভাগ্যের সন্ধানে সম্ভ্রমের কড়ি গুনলেন কিশোরী লিলি। অবৈধ পাসপোর্ট বা ভুয়া মেডিক্যাল রিপোর্ট, প্রবাসে নির্যাতিত জীবন অতঃপর পিতৃ পরিচয়হীন সন্তান; কে নেবে দায়ভার?  

পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে জর্ডান ১ বছর ৫ মাসের অধিক সময় অবস্থান করে নিঃস্ব আর অন্তঃসত্বা হয়ে ফেরা মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের লিলি (ছদ্মনাম)। দেশে ফিরবার পর কোল জুড়ে এসেছে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান। এদিকে অন্তঃসত্বা হয়ে ফেরার পর থেকেই সমাজে নিগৃহীত হচ্ছে পরিবারটি। 

গত ২৩ আগস্ট লিলি একটি কন্যা সন্তান প্রসবের পর থেকে সমাজপতিরা তার পরিবারকে সমাজচুত্য (একঘরে) করে রেখেছে।

গত রবিবার ভুক্তভোগী ঢাকা ট্রিবিউনকে জানায়, অবিবাহিত ১৫ বছর বয়সী লিলিকে ২৫ বছর বয়সী বিবাহিতা হিসেবে পাসপোর্ট করে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে জর্ডানে যাবার ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা বলেন আবুল কাশেম। এ ব্যাপারে তার পরিবার কোনো কিছুই জানতেন না। মেডিক্যাল রিপোর্টেও তাকে অবৈধভাবে বিবাহিত দেখানো হয়েছে। 

জর্ডানে যাবার পর থেকেই প্রতিরাতে দেহ ব্যবসা করতে বাধ্য করা হয় লিলিকে। দ্বিমত করলে শারীরিক ভাবে নিযাতন চালানো হতো। এমনও দিন গেছে তার পায়ে শিকল দিয়া ঘরে আটকে রাখা হতো। 

প্রথমে যে বাসায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রথম রাত থেকে তার উপর যৌন হয়রানী শুরু হয়। এক পর্যায়ে বাসার মালিক তাকে তার বাসায় কয়েক মাস থাকার পর তাকে বিক্রি করে দেয়া হয় দেওয়ার পর সোনিয়ার নামে এক বাংলাদেশির কাছে। তার বাড়িও সিঙ্গাইর উপজেলায়। সোনিয়া তাকে ভালো কাজ দেয়ার কথা বলে নিজের বাসায় নিয়ে আসেন। 

এলাকার মানুষ পেয়ে পায়ের তলায় মাটি ফিরে পেয়েছেন এমন তৃপ্ত অনুভবের প্রথম রাতেই তাকে ভিন দেশী একজনের শয্যাসঙ্গী হতে হয়েছে তাকে। জর্ডানের দাম্মাম শহরের যে বাড়িতে সোনিয়া থাকতো সেখানেও যে আরেক নরক যন্ত্রণা পোহাতে হবে সেটি কখনো ভাবেননি লিলি।

ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ জর্ডানে থাকা সোনিয়া একটি বাসা ভাড়া নিয়ে তার মতো আরো ২০ থেকে ৩০ জন নারীকে দিয়ে জোড়পূর্বক দেহ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। প্রায় ১৬ বছর ধরে সোনিয়া জর্ডানে অবস্থান করায় স্থানীয় ভাবে সোনিয়া খুব প্রভাবশালী বলে জানান তিনি। 

জর্ডানে পৌছানোর পর লিলির সাথে তার পরিবারের কোন ধরনের যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি। স্থানীয় দালাল কাশেমের কাছে তার খোঁজ নিতে গেলে সে জানিয়েছিল সে জর্ডান থেকে পালিয়ে গেছে। 

লিলির রিক্সা চালক পিতা আর গৃহিণী মা, মেয়ের এই পরিণতির জন্য পাশ্ববর্তী জয়মন্ডপ ইউনিয়নের ভাকুম গ্রামের আবুল কাশেম ও জর্ডানে থাকা একই উপজেলার চান্দহর ইউনিয়নের চর চামটা গ্রামে নিহাজ উদ্দিনের মেয়ে সোনিয়াকে দায়ী করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দাবী করছেন।

পরে আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে মামলায় আপোষ করতে বাধ্য হয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার। আর মামলাটি মিটানোর জন্য প্রতিশ্রুত ২০ হাজার টাকাও পরিবারটিকে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

ভুক্তভোগী নারী জানালেন তাকে দীর্ঘ দিন আটকিয়ে রেখে দেহ ব্যবসা করানো হলেও তাকে শুধু তিন বেলা ভাত দেয়া হতো। একটি টাকাও পারিশ্রমিক বাবদ দেয়া হতো না। টাকা চাইলে উল্টো মারধর করা হতো। টানা এক বছর পাঁচ মাস জর্ডানে থাকার পর পড়নের কাপড় আর অন্তঃসত্বা হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে। 

লিলির আকুতি তার মতো আরো ত্রিশ নারীকে সোনিয়া খপ্পর থেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোন। নয়তো তার মতো কলংকিত হয়ে দেশে ফিরতে হবে। 

লিলির মা জানান, মেয়ের কন্যা সন্তান কার পরিচয়ে বড় হবেন তা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় তিনি। গত বৃহস্পতিবার সিঙ্গাইর হাসপাতালে লিলির স্বামীর পরিচয় দেওয়া হয়েছে অস্থিত্বহীন সিদ্দিক নামের একজনকে। এটা অন্যায় হয়েছে জেনেও ডাক্তারদের চাপে ওই ভুয়া নামটি ব্যবহার করা হয়েছে।    

লিলির পিতা বলেন, সমাজের মাতব্বর আলেক উদ্দিন কোরবানী ঈদের আগে তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে সমাজ থেকে তাকে একঘড়ে করা হয়েছে। তাকে ওই সমাজের কোন লোক কোন সহযোগিতা করবে না।    

এদিকে, স্থানীয় আদম ব্যবসায়ী আবুল কাশেমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, অনেক নারী শ্রমিককে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন। লিলির মতো এমন ঘটনা কারো সাথে হয়নি। এর জন্য তিনি দায়ী নন। স্থানীয় আয়েশা নামের এক নারীকে দায়ী করে এই অভিযুক্ত জানান, তিনি তাকে ম্যান পাওয়ার করিয়ে দিয়েছি মাত্র। জর্ডানে যাওয়ার ব্যাপারে আয়েশা সবকিছু করে দিয়েছে। এই নিয়ে লিলির বাবা মামলা করেছিল। বিদেশ থেকে আনার পর স্থানীয় ভাবে বসে মামলাটি আপোষ করা হয়েছে। 

সিঙ্গাইরের ধল্লা ইউনিয়েন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ জাহিদুল ইসলাম ভুঁইয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কোন কিছু তিনি জানেন না, তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানবেন।

সিঙ্গাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার ইমাম হোসেন জানান, অন্তঃসত্বা হয়ে নারী শ্রমিক দেশে এসে সন্তান প্রসবের ঘটনা তার জানা নেই। এব্যাপারে ওই মেয়েটির পরিবার যদি আইনগত সহায়তা চান সেক্ষেত্রে তিনি আইনগত সহায়তা করবেন বলে জানান।