• রবিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৪৯ সকাল

বাংলাদেশে কেন ডলফিন শিকার হচ্ছে?

  • প্রকাশিত ০৮:১৩ রাত সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮
ডলফিন
ধরলা নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়া বিশাল আকৃতির ডলফিন। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

শুধু ডলফিনই নয়, বাড়তি আয়ের জন্য এসব নির্মমতার শিকার হচ্ছে জেলেদের জালে আটকে পড়া কাছিমও।

গতকাল মঙ্গলবার কুড়িগ্রামের ধরলা নদীতে বিকাল চারটা নাগাদ মৎস্য আহরণে ব্যস্ত কয়েকজন জেলের জালে হঠাৎ করেই ধরা পরে একটি ডলফিন। আর সেই ডলফিন ধরা পড়ার খবর ধরলা তীরবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা দেখার জন্য নদীর পাড়ে শতশত উৎসুক মানুষ ভিড় করে। 

ধরলায় ধরা পড়া ডলফিন বাজারে প্রদর্শিত হবার কিছুক্ষণ পরেই খবর আসে, যেকোনও মুহূর্তে তা কেটে ফেলা হতে পারে সেটি। আর এমন খবরে তাৎক্ষণিক সেখানে ছুটে যান রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাশেদুল হক প্রধান। উদ্দেশ্য, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির এ প্রাণিকে রক্ষা করা।

রংপুর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের  পরপরই গাড়ি ও জনবল নিয়ে ছুটে আসেন তারা। রাত ১২ টার দিকে স্থানীয় যুবকরা ডলফিনটিকে কোলে করে রংপুর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের গাড়িতে তুলে দেন ডলফিনটি। ডলফিনটি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটি রংপুর চিড়িয়াখানার উদ্দেশে রওয়ানা হয়।

ধরলায় ধরা পড়া ডলফিনের এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। চলতি বছরের জুন মাসের শেষের দিকে দু’টি, আগস্টে তিনটি এবং সেপ্টেম্বারের শুরুতেই একটি- এই মোট ছয়টি বিরল প্রজাতির ডলফিন ধরা পড়ে ধরলা এবং ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-দুধকুমার নদের মোহনায়। 

তবে এই ছয়টির মধ্যে শুধু এই একটিই প্রাণে রক্ষা পায়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল বটে ডলফিনটির। তাই হয়ত তার ভাগ্যের পরিনতি একটু বাড়তি টাকা রোজগারের জন্য শিকারী জেলেদের হাতে হত্যা হওয়া বাকি পাঁচটি ডলফিনের মত হয়নি।

জেলার ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদীতে মৎস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহকারী কয়েকজন জেলের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস অব্দি গত চার মাসে ধরলা এবং ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-দুধকুমার নদের মোহনায় ছয়টি ডলফিন ধরা পড়ে। এদের মধ্যে সম্প্রতি গত ৪ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা নদী এলাকায় ধরা পড়া ডলফিনটি ছাড়া বাকি অন্য পাঁচটি ডলফিনই হত্যার শিকার হয়।

কথা হয় কয়েকটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা এবং জেলেদের সাথে। সরেজমিনে ঘুরে জানা যায় এসব বিরল প্রাণীদের বিপন্ন এবং প্রায় বিলুপ্ত হবার পেছনের কারণগুলো।

যথাযথ নজরদারি এবং সুনির্দিষ্ট আইনের অভাব

কুড়িগ্রামের নদ-নদী গুলোতে বছরের বিভিন্ন সময় বিরল প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মৎস্য জাতীয় প্রাণী ডলফিন শিকার হলেও যথাযথ নজরদারি এবং সুনির্দিষ্ট আইনের অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিকারকৃত ডলফিনগুলো হত্যা করা হচ্ছে। জেলার নদী তীরবর্তী কয়েকটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও),  মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা এবং জেলেদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া যায়।

এসব প্রাণীর শিকারে স্থানীয় প্রশাসন থেকে কোনও বাধা প্রদান করা হয় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে জানান, জেলেরা সারা রাত ধরে মাছ শিকার করে ভোর বেলা সেগুলো বাজারজাত প্রক্রিয়া শুরু করে। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনের খবর পাওয়ার খুব একটা সুযোগ থাকে না।

বাড়তি আয়ের পথ 

জানা যায়, বাড়তি টাকা রোজগার এবং ব্যথা নাশক ওষুধ ও মাছ ধরার টোপ হিসেবে ডলফিনের তেল ব্যবহারের উদ্দেশে এসব ডলফিন হত্যা করছেন শিকারী জেলেরা।

মুকুল ও বাবুল সহ ওই এলাকার আরও কয়েকজন জেলে বলেন, ‘আমরা রোজগার করার জন্য মাছ ধরি। হঠাৎ কোনও দিন জালে শুশুক (ডলফিন) বা কাছিম ধরা পড়লে আমাগো বাড়তি কামাই (রোজগার) হয়। পেট বাঁচাইতে আমরা সেগুলা (ডলফিন কিংবা কাছিম) বিক্রি করি।'

মাছ ধরার টোপ হিসেবে 

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ও বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের অধীন ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-দুধকুমার নদের মোহনায় নিয়মিত মাছ শিকার করেন এমন একজন জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানান, ডলফিনের চামড়া থেকে তেল উৎপাদন করা হয়। ডলফিন ধরা পড়লে জেলেরা সেই ডলফিনের চামড়া কেটে বিভিন্ন পাত্রে রাখে। কয়েকদিন পর সেই চামড়া পঁচে তেল তৈরি হয়। পরে জেলেরা ওই তেল জ্বালানী কাঠের কয়লার সাথে মিশিয়ে নদীতে ছিটিয়ে দেয়। এতে করে জেলেদের জালে প্রচুর ঘারুয়া নামক মাছ ধরা পড়ে।

ব্যথা নাশক কবিরাজিতে

এদিকে কয়েকজন জেলের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ডলফিন থেকে তৈরি করা তেল মানব শরীরের কোমর ও পায়ের বিভিন্ন জয়েন্টের ব্যথা উপশমে বেশ কার্যকর। এ জন্য অনেক গ্রাম্য কবিরাজও এসব ডলফিন উচ্চ মূল্যে ক্রয় করেন। পরে তারা তেল তৈরি করে সেই তেল বাজারে বিক্রি করেন, যা প্রতি কেজি ৪০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হয়।

উলিপুর উপজেলায় নিয়মিত বিরতিতে জেলেদের জালে ডলফিন ধরা পড়লেও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনও তথ্য নেই। তবে শুনেছি শুশুকের তেল ব্যাথা নাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়’।

আইনের জালেই ডলফিনের মৃত্যু?

ডলফিন শিকারের ব্যাপারে জানতে চাইলে ফুলবাড়ী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহমুদুন্নবী মিঠু জানান, ‘বিভাগীয় পরীক্ষার জন্য আমি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছি। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন,১৯৫০ অনুযায়ী যে সকল মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে সেখানে ডলফিন বা শুশুক সংরক্ষণের ব্যাপারে কোনও নির্দেশনার উল্লেখ নেই। তাই জেলেদের জালে ডলফিন ধরা পড়লেও তা উদ্ধারে আমরা উদ্যোগ নিতে পারি না’।

তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে, ডলফিন একটি মৎস্য জাতীয় প্রাণীটি হলেও তা শিকারের বিরুদ্ধে মৎস্য বিভাগ কেন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না- জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান ‘মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন,১৯৫০’ উল্লেখ করে জানান, ‘আইনের সীমাবদ্ধতা ছাড়াও জনবল সংকট থাকার কারণে আমরা তাৎক্ষণিক কোনও ব্যবস্থা নিতে পারি না।’

ইচ্ছাই যখন উপায়

জেলার ধরলা নদীতে সর্বশেষ শিকার করা ডলফিনটি উদ্ধারকারী রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুল হক প্রধান জানান, ‘জীব বৈচিত্র রক্ষায় বিলুপ্তপ্রায় কোনও প্রাণীকে উদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনও আইনের প্রয়োজন নেই। ডলফিন শিকার বন্ধে মৎস্য আইনে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ আইনের মাধ্যমে বিলুপ্ত প্রায় এই জলজ প্রাণীটিটি শিকার ও হত্যা বন্ধ করা সম্ভব। এজন্য আমাদের সকলকেই আন্তরিক হতে হবে।’

শুধুই ডলফিন নয়, এসব নির্মমতার শিকার হয় জেলেদের জালে আটকে পড়া কাছিমও। উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ও বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের অধীন ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-দুধকুমার নদের মোহনায় নিয়মিত মাছ শিকার করেন এমন একজন জেলে জানান, আগস্ট মাসে ওই মোহনায় দুটি কাছিম (কচ্ছপ) ধরা পড়ে। কাছিম শিকার সম্পর্কে তিনি জানান, আমরা মুসলমান জেলেরা কাছিম না খেলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই শিকারকৃত কাছিম কিনে নেন।

আর তাই ডলফিন কিম্বা কাছিম- সুনির্দিষ্ট কোন আইন না থাকলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাণীজগতের বিরল এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীগুলোকে বাঁচাতে খানিকটা মানবতা আর ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।