• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৭ সকাল

শরীয়তপুরে ১০ বর্গ কিমি গ্রাম-শহর তলিয়ে গেছে পদ্মায়

  • প্রকাশিত ০৪:২৮ বিকেল সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮
পদ্মা
পদ্মার ভাঙ্গনে নড়িয়ার ১০ বর্গকিমি বিলীন। ছবি: মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

পদ্মার আগ্রাসী ছোঁবল, ছোট হয়ে আসছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মানচিত্র, কোটিপতিদের আশ্রয় এখন অন্যের বাড়ি, মানবিক বিপর্যয়ের মুখে এক বৃহৎ জনপদ।    

বহুলাকাঙ্খতি পদ্মাসতেু থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরইে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ানক নদী ভাঙ্গনের শিকার পদ্মাপাড়ের শরীয়তপুরবাসী।

শতাব্দীর ভয়াবহতম এই ভাঙ্গনের কবলে পরেছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা একটি বৃহত জনপদ। সমাজের হতদরিদ্রদের পাশাপাশি স্বচ্ছল আর ধনী পরিবারগুলো তাদের শত বছরের আবাসস্থল হারিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে অন্যের জমি বা বাড়িতে। 

গত এক মাসে পদ্মা নদীর আগ্রাসী ছোঁবলে বিলীন হয়েছে ৫ হাজারেরও বেশী মানুষের বসত বাড়ি, ফসলি জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক, মসজিদ, মন্দির, পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ লাইন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ মানুষের স্থাবর-অস্থবর সকল সম্পদ। 

উপজেলার নড়িয়া পৌরসভা, মোক্তারের চর ইউনিয়ন ও কেদারাপুর ইউনিয়নের প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার জমি তলিয়ে গেছে পদ্মার বুকে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে ঘটেনি। ঠিকমত দু’বেলা খাদ্য আর চিকিৎসা সেবার সুযোগ না থাকায় গোটা এলাকা জুরে হাতছানি দিচ্ছে এক মানবিক বিপর্যয়

 ছবি: মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

গগণ বিদারী আর্তনাদ

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে সর্বহারা মানুষদের চরম দুর্দশার চিত্র, শুনা গেছে মানুষের গগণ বিদারী বুক ফাঁদা আর্তনাদের করুণ শব্দ। কথা বলি, কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ঈমাম হোসেন দেওয়ানের সাথে। আশ্রয় নিয়েছেন নড়িয়া পৌর এরাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে। ১৫ বছর ছিলেন এই ইউনিয়নের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। 

চাচা আব্দুল করিম দেওয়ান চেয়ারম্যান ছিলেন ৫০ বছর। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ সদস্যও ছিলেন দীর্ঘদিন। ঈমান হোসেন দেওয়ানের ৫ একর জমি সমেত একটি সাজানো বসত বাড়ি ছিল। আরো ৫০ একর ছিল ফসলি জমি। বাড়িতে পাকা-সেমি পাকা ঘর ছিল অন্তত ১২টি। 

মাত্র কয়েকদিন আগেও ঈমাম হোসেন দেওয়ানের সকাল শুরু হতো বৈঠক খানায় শত মানুষের কোলাহলের মাঝে। আজ সেই ঈমাম দেওয়ান নি:স্ব, তার বাজারের বহুতল পাকা ভবন নেই, বাড়িতে সাজানো সাঁড়ি সাঁড়ি ঘর নেই। নেই দামী বিছানা-আসবাব। সব কিছুই কেড়ে নিছে রাক্ষুসী পদ্মা। তার বুক ফাঁদা কান্না শুনলে কোন সুস্থ্য মানুষ স্থির থাকতে পারেনা। 

ছবি: মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

ঈমাম হোসেন দেওয়ান প্রলাপের সাথে বলছিলেন, “এখন আর কাঁদতেও পারিনা। চোখের সব পানি শুকিয়ে গেছে। আমরা হাজার হাজার মানুষ সব হারিয়েছি নদী গর্ভে। সরকার আমাদের রক্ষার জন্য হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিল, সময় মত প্রতিরক্ষা বাঁধ দিলে স্মরণ কালের এই ভয়ংকর ভাঙ্গনের শিকার আমরা হতাম না। আর কিছুই চাইনা, সরকার যেন এই এলাকাটিকে দূর্গত এলাকা ঘোষণা করেন, যেন মানুষের মাথা গোজার একটু আশ্রয় করে দেয়”। 

শুধু ঈমান হোসেনই নন, তার আপন ৫ ভাই, চাচাতো ভাই, বংশের অন্য সকলের অন্তত ২ শত একর জমি, বাজারের মার্কেট, বাড়ির পাকা বহুতল ভবন, ক্লিনিক সহ অন্তত কয়েক শত কোটি টাকার সম্পদ বিলীন হয়েছে নদী ভাঙ্গউত্তর কেদারপুর জেলে পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে আরেক করুণ চিত্র। ওই গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আবাস। বেশীরভাগ লোকই মৎসজীবী, নরসুন্দর পেশায় জড়িত। গ্রামে ছিল শত বছরের পুরানো সত্য নারায়ন সেবা মন্দির। চোখের সামনেই বিলীন হলো শত ফুট উঁচু মন্দিরের স্থাপনাসহ উপসনার সবগুলো চিহ্ন। 

ছবি: মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

এই মন্দিরের সভাপতি কার্ত্তিক চন্দ্র ও তার স্ত্রী বীণা রানীর কান্নায় ভারী হয়ে উঠছিল বাতাস। তাদের আর্তনাদে সব কিছু যেন নিথর-স্থবির হয়ে যাচ্ছিল। কার্ত্তিক চন্দ্র বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, “৭১’এ সব হারিয়েছি হানাদারদের ছোঁবলে। তবুও টিকে ছিলাম বাপ-দাদার ভিটে মাটি আকড়ে ধরে। আজ রাক্ষুসী পদ্মা সব কিছু ছিনিয়ে নিল। এখন কোথায় থাকবো, কি খাব, কার কাছে যাব, আর ঠাকুরের নামে পূঁজা অর্চণাই বা করবো কোথায় গিয়ে?”

অর্থবরাদ্দ হলেও নেই বাস্তবায়ন 

চলতি বছরের ২ জানুয়ারী জাজিরার কুন্ডেরচর থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার এলাকায় পদ্মার ডান তীর প্রতিরক্ষার জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে সরকার ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেন। 

কিন্তু নানা জটিলতায় শুষ্ক মৌসুমে বাধ নির্মাণের কাজ শুরু না করায় এ বছরও ভাঙ্গন শুরু হয়েছে ব্যাপক এলাকা নিয়ে। 

বর্তমান ভাঙ্গন কবলিত চার কিলোমিটার এলাকায় জরুরী প্রতিরক্ষামূলক কাজ করার জন্য ২০ কোটি টাকার আবেদন করা হলে মাত্র ২ কিলোমিটার ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় বালু ভর্তি জি,ও ব্যাগ ফেলার জন্য তিন দফায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকার অনুমোদন পাওয়া গেছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং এত টাকা খরচ করেও ফল আসেনি। 

এদিকে সময়মত মূল প্রকল্পের কাজ না করায় ক্ষোভ জমেছে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে। তাদের দাবী স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতাদের রেষারেষি এবং সমন্বয় হীনতার কারনেই গত শুষ্ক মৌসুমে প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি।

ক্ষমতাসীনদের স্বার্থের যাতাকলে পিষ্ট জনগণ

স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের এক সূত্র জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে  আওয়ামী লীগের দুই নেতার মনোনয়নের রেষারেষিতে আটকে আছে এই বাঁধ প্রকল্পের কাজ। স্থানীয় সামাজিকভাবে প্রভাবশালী একজন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন যে, নির্বাচনী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারদলীয় সংসদ সদস্য চাইছেন প্রজেক্টটি তাঁর তদারকিতে করতে, যাতে করে জনগণের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ও দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশীর নেতা চাচ্ছেন কাজটি তিনি করে জনগণের কাছে নিজেকে জাহির করতে ও দলের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে। এই দুই নেতার ব্যক্তিক রেষারেষিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে জনগণ।  

বিশেষজ্ঞের মতামত

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের ‘হাইড্রোগ্রাফি’র পরিচালক শামসুন নাহার জানান সম্প্রতি এই দূর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে জরিপ চালানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “সেখানে স্রোত এতোটাই তীব্র ছিলো যে, জরিপ কাজে ব্যবহৃত আমাদের জাহাজটিকে স্থির রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছিলো। নড়িয়া উপজেলার পাড়ের কাছাকাছি এলাকায় নতুন চর জেগেছে। আর এই বিশাল চরের প্রভাবেই পাড়ের দিকে স্রোত ও ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে গেছে। নদীর স্রোত ওই চরে বাধা পেয়ে নড়িয়া পাড়ে ঘন্টায় ৫.৫৩ মাইল বেগে এসে ধাক্কা দেয়। পাড়ের সংলগ্ন নদীর গভীরতা ২২-৩২ মিটার পর্যন্ত।” 

তিনি আরও বলেন, “নড়িয়া উপজেলাকে রক্ষা করতে হলে ওই চর থেকে স্রোতের দিক পরিবর্তন করাতে হবে। আমরা জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মাহফুজুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।

‘হাইড্রোলজি’ বিশেষজ্ঞ ডঃ আইনুন নিশাত বলেন, “পদ্মা তার নিজের মতো করেই চলে। পদ্মাকে আপনি গণিত বা বিজ্ঞান দিয়ে অনুমান করতে পারবেন না। নদী ভাঙ্গন প্রাকৃতিক বিষয়। এই এলাকায় আরও দু’বছর ভাঙ্গন হতে পারে। পদ্মাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে গেলে আগে আপনাকে এর আকারটা দেখতে হবে। গড়াই বা মধুমতির ক্ষেত্রে যা খেটেছে, সে সূত্র এখানে খাটবে না।”