• শুক্রবার, অক্টোবর ১৯, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৩ রাত

উদ্বাস্তু শিবিরে থেকেও শিক্ষার আলোর স্বপ্নে রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীরা

  • প্রকাশিত ১২:৪৭ দুপুর অক্টোবর ১১, ২০১৮
রহিমা আক্তার
বিশ্বের সবচাইতে শিক্ষিত রোহিঙ্গা নারী হতে চান রহিমা আক্তার। ছবি: এপি/ইউএনবি।

বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য নিজের রোহিঙ্গা পরিচয় আড়াল করতে তিনি শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলেন এবং বাংলাদেশি মেয়েদের মতো পোশাক পরেন। তবে তাকে সবচেয়ে প্রতিকূল লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয় নিজের ঘরে

রহিমা আক্তার, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক উদ্বাস্তু শিবিরে জন্ম ও বেড়ে উঠা ১৯ বছর বয়সী এক নারীর নাম। যে বয়সে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা কিশোরীদের সন্তান থাকে সেই বয়সে তার রয়েছে ভিন্ন এক পরিকল্পনা। তিনি বিশ্বের সবচাইতে শিক্ষিত রোহিঙ্গা নারী হতে চান।

১৯৯০’র দশকের শুরুর দিকে জোরপূর্বক শ্রম, ধর্মীয় নিপীড়ন ও বৌদ্ধ জনতার সহিংস হামলা থেকে বাঁচতে যে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন তার মধ্যে ছিলেন রহিমার বাবা-মাও।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড়ের কোলে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী এক আশ্রয় শিবিরে রহিমার জন্ম। পুরোটা জীবনও কেটেছে এই অস্থায়ী আবাসস্থলে।

এরপর, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর শিবির এলাকায় কাজ করতে আসা সাহায্য সংস্থার কর্মী ও সাংবাদিকদের দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রহিমা। এই পালিয়ে আসা রহিঙ্গারা বাংলাদেশে নিরাপত্তা পেলেও শিক্ষা পাওয়ার নিশ্চিয়তা থেকে তারা অনেক দূরে রয়ে গেছে। 

রহিমা মনে করেন শিক্ষা তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, “যদি আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি তাহলে জীবনের মতো একটি জীবন ধারণ করতে পারব”।

তবে দুঃখের বিষয়, রহিমাসহ মাত্র অল্পকিছু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু মেয়েই উচ্চ বিদ্যালয়ের সমমানের বাংলাদেশি শিক্ষা সম্পন্ন করতে পেরেছেন। রহিমার জন্য এই কৃতিত্ব অর্জন করা ছিল ভীষণ কঠিন। শিক্ষার এই অধিকার আদায় করে নেওয়ার জন্য রহিমাকে শিবিরের তল্লাশি চৌকি ফাঁকি; এমনকি, ভর্তির জন্য সরকারি বিদ্যালয়ের বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ঘুষও দিতে হয়েছে।

ইউনিসেফের তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থানরত লাখের অধিক রোহিঙ্গা শিশুর মধ্যে ছয় থেকে ১৪ বছর বয়সী এক লাখ ৪০ হাজার শিশুকে ১২শ অস্থায়ী বিদ্যালয়ে ইংরেজি, গণিত, বার্মিজ, বিজ্ঞান ও চারুকলা শেখানো হচ্ছে। কিন্তু, অস্থায়ী এই বিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয় হয় মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। তাই, রহিমার মতো উদ্বাস্তুদের উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করার লক্ষ্যে গোপনে কক্সবাজার ও অন্যান্য শহরের বিদ্যালয়ে ভর্তি নিতে হয়।

অন্যদিকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত উদ্বাস্তু শিশুদের হারানো প্রজন্ম নামকরণ করেছে ইউনিসেফের কর্তৃপক্ষ। ইউনিসেফের মূখপাত্র শাকিল ফয়জুল্লাহ মন্তব্য করেন, “তাদের জন্য কিছু করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হয়েছে”।

উদ্বাস্তুরা মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করবে এই ধরণের একটি অনুমান থেকে ইউনিসেফ বেশী বয়স্ক শিক্ষার্থীদের মৌলিক ক্লাস শুরু করানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বলেও অবহিত করেন শাকিল ফয়জুল্লাহ।

তবে, রহিমা বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, “বর্তমানে মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাবিরোধী পরিস্থিতির মাঝে তার পরিবারের ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়”। ফলে মৌলিক শিক্ষার এই বিষয়টি আসলে কতটা ফলপ্রসূ তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। কাজেই রোহিঙ্গাদের শিক্ষার বিষয়টি অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে।

রহিমা বলছিলেন মৌলিক অধিকার শিক্ষার অধিকার অর্জন করতে তাকে কি কি দুর্গম পথ ও সময় পাড়ি দিতে হয়েছে। তিনি জানান যে, বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য নিজের রোহিঙ্গা পরিচয় আড়াল করতে তিনি শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলেন এবং বাংলাদেশি মেয়েদের মতো পোশাক পরেন। তবে তাকে সবচেয়ে প্রতিকূল লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয় নিজের ঘরে।

উল্লেখ্য, বেশির ভাগ রোহিঙ্গা মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৬ বছরের মধ্যে, মাঝেমধ্যে তা ১৪ বছরেও হয়। তাই রহিমাকেও লড়াই করতে হয়েছে তার বাবার সাথে। তার বাবা মনে করেন রহিমার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে। লেখাপড়া অব্যাহত রাখার জন্য রহিমা তার বাব-মায়ের কাছে করজোড়ে অনুনয় করেছেন, কেঁদেছেন দিনের পর দিন।

তবে তার শিক্ষা গ্রহণের পথে বড় ভূমিকা রেখেছেন তার মা। উল্লেখ্য, রহিমার মা মিনারা বেগমও মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হিসেবে পালিয়ে এসেছিলেন। তবে, তিনি কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। তাই তিনি নিজের বড় মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলতে চেয়েছেন। এর জন্য তিনি শুধু স্বামীকেই বোঝাননি, সেই সাথে নিজ সম্প্রদায়ের বয়স্কদের লাঞ্ছনাও প্রতিহত করেছেন, যারা মনে করেন মেয়েদের বাইরের দুনিয়ায় পাঠানো পাপ।

যার ফলে মিনারা বেগম এখন তার চার মেয়ের তিনজনকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন এবং তার আশা, সবচেয়ে ছোট মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকেও তিনি শিক্ষিত মানূষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন। তবে, সন্তানদের পড়াশোনা চালাতেও বহুধরণের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। এজন্য তাদের খাবারের খরচ কমাতে হয়েছে। তবুও তারা এটা করছেন কারণ তাদের আশা তাদের সন্তান বড় হয়ে একদিন তাদের জীবন থেকে উদ্বাস্তু হবার কলঙ্ক মুছে দেবে শিক্ষার আলোয়।

মিনারা বেগম বলেন, “‘আমরা রোহিঙ্গা। আমাদের পায়ের নিচে কোনো মাটি নেই। আমাদের কোনো ভবিষ্যত নেই। আমাদের অবস্থা খাঁচায় থাকা মুরগির মতো। আমরা এমনকি যে গাছ লাগিয়েছি তার ফলও দাবি করতে পারি না”। 

তবে, বৃথা যায়নি অতি নিষ্ঠার সাথে লাগানো মিনারা বেগমের শিক্ষার গাছ, ফল দিতে শুরু করেছে তা। শিক্ষা গ্রহণের প্রেক্ষিতে রহিমা এখন যে অর্থ আয় করছেন তা পুরো পরিবারের মোট আয়ের চেয়েও বেশি। 

রহিমা এখন ব্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে পাশাপাশি করছেন নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহের কাজ। তার পরিকল্পনা এখন মানবাধিকার নিয়ে পড়াশোনা এবং চূড়ান্তভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার গবেষণা প্রকাশ করা।