• শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৯ সকাল

হাসপাতাল চিকিৎসা দেয়নি, গাছের নিচেই সন্তান জন্ম দিলেন প্রসূতি

  • প্রকাশিত ০৭:৩২ রাত জানুয়ারী ১৯, ২০১৯
পঞ্চগড় গাছের নিচে সন্তান
শনিবার পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই গাছের নিচেই সন্তান জন্ম দেন এক প্রসূতি। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

"আমাদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে তা অমানবিক"

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা দেয়নি তাই পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে গাছের নিচে বাচ্চা প্রসব করেছেন এক নারী। কর্তৃপক্ষের জোরাজুরিতে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সময় গাছের নিচেই ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন রীনা বেগম (৩০)। 

শনিবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের টনক নড়ে। এ ঘটনায় হাসপাতালের মিডওয়াইফ নার্স শাবানা বেগমকে শোকজ এবং তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিন দিনের মধ্যে ওই নার্সকে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

ওই নারীর পরিবারের লোকজন জানান, এর আগে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে প্রথম সন্তান জন্ম দেন রীনা। এ কথা জানার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড়পত্র দিয়ে পঞ্চগড় কিংবা ঠাকুরগাঁওয় জেলা সদরে নিয়ে যেতে বলে। সে সময় তার স্বামী জাহিদুল ইসলাম হাসপাতালে ছিলেন না। ছাড়পত্র পাওয়ার খবর পেয়ে তিনি অন্য হাসপাতালে যাওয়ার জন্য গাড়ি ও টাকা জোগাড় করতে বাজারে ছিলেন বলে পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন।  

হাসপতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১৮ জানুয়ারি) গভীর রাতে বোদা উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়নের বালাভিড় গোয়ালপাড়া এলাকার জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী রীনা বেগম প্রসব বেদনা অনুভব করেন। শনিবার ভোরে তাকে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে পরিবারের লোকজন। এদিন দুপুরে রীনার প্রথম সন্তান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম দেয়ার কথা শুনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই গৃহবধূকে ছাড়পত্র দিয়ে পঞ্চগড় অথবা ঠাকুরগাঁওয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেয়। ছাড়পত্র দেওয়ার পরও ওই রোগী হাসপাতাল ত্যাগ না করায় অভিযুক্ত নার্স শাবানা বেগম তাদেরকে হাসপাতালের বেড ছেড়ে দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করতে থাকেন। কিন্তু প্রসূতির স্বামী হাসপাতালে ফিরে না আসায় তারা সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। 

একাধিকবার চাপ দেয়ায় বিরক্ত হয়ে ওই গৃহবধুর ননদ তাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আসার পথে হাসপাতাল চত্বরের ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে আসলে পুনরায় ওই গৃহবধূ ব্যথা অনুভব করতে থাকেন। এসময় তাকে ওই গাছের নিচে বসানো হলে সেখানেই একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। 

বিষয়টি দেখতে পেয়ে হাসপতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সোহাগী এসে সদ্যোজাত শিশুটির নাড়ি কেটে মা ও শিশুটিকে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যান। ততক্ষণে বিষয়টি স্থানীয়রা ছবি তুলে ও ভিডিও করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে বিষয়টি নিয়ে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। 

এ ঘটনায় প্রসূতির স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. আফরোজা বেগম রীনা ও বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদ হাসানসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি শুনে তাৎক্ষণিক ওই রোগীকে অর্থ সহায়তা দেন। ওই প্রসূতির পরিবারসহ স্থানীয়রা দোষীদের বিচার দাবি করেছেন।

প্রসূতি রীনা বেগম বলেন, ছাড়পত্র দেওয়ার পর আমি আমার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু নার্স আমাকে ও আমার ননদকে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করে। নিরুপায় হয়ে আমরা হাসপাতালের বাইরে একটি গাছের নিচে আশ্রয় নেই। সেখানেই আমার সন্তান প্রসব হয়।

রীনা বেগমের স্বামী জাহিদুল ইসলাম জানান, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা শুনে আমি টাকা ও গাড়ি জোগাড় করতে বাজারে ছিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে তাদেরকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া ঠিক হয়নি। আমাদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে তা অমানবিক। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।

বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এসআইএম রাজিউল করিম রাজু জানান, ওই মিডওয়াইফ নার্স শাবানা বেগমকে শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনার কারণ জানতে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. জাহিদ হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ নেওয়া হবে।  

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদ হাসান জানান, বিষয়টি জানতে পেরে আমি তাৎক্ষনিক হাসপাতালে ওই রোগীকে দেখতে যাই। আমি বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগকে অবহিত করি। 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মিডওয়াইফ নার্স শাবানা বেগম বলেন, রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে আমি তাদের অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি মাত্র।