• শনিবার, জানুয়ারী ১৮, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৯ সকাল

ভাষাসৈনিক জিয়াউল: আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলো না

  • প্রকাশিত ০২:৪৬ দুপুর ফেব্রুয়ারি ৩, ২০১৯
ভাষাসৈনিক খান জিয়াউল হক
ভাষাসৈনিক খান জিয়াউল হক। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

‘স্থানীয় অনেক বেসরকারি সংস্থা আমাদেরকে সম্মান জানালেও স্থানীয় প্রশাসন কোনদিন আমাদেরকে ভাষাসৈনিক হিসেবে কোন অনুষ্ঠানে ডাকেনি’

জীবনে যা পেযেছি তা অনেক। তবে একটাই আক্ষেপ। আজ পর্যন্ত ভাষা সৈনিকদেরকে কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলোনা- কথাগুলো বললেন মাগুরার একমাত্র জীবিত ভাষাসৈনিক খান জিয়াউল হক। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের মত কেন ভাষাসৈনিকদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়না।

খান জিয়াউল হক বলেন, স্থানীয় অনেক বেসরকারি সংস্থা আমাদেরকে সম্মান জানালেও স্থানীয় প্রশাসন কোনদিন আমাদেরকে ভাষাসৈনিক হিসেবে কোন অনুষ্ঠানে ডাকেনি।

৯২ বছর বয়সী ভাষাসৈনিক খান জিয়াউল হকের কাছে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি এখনো স্পষ্ট। ১৯৪৮ সালে খান জিয়াউল হক যশোর এমএম কলেজের ছাত্র । তখনই মূলত; ঊর্দূকে রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা এলো। এসময় এমএম কলেজর সাধারণ ছাত্ররা প্রতিবাদ মিছিল করে। সেই মিছিলে খান জিয়াউল হক ছিলেন অগ্রভাগে। তবে ৪৮ এ খুব বেশি আন্দোলন দানা বাধেনি যশোরে। 

১৯৪৯ সালে খান জিয়াউল হক ছাত্র সংসদে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫০ এ নির্বাচিত হন সভাপতি। ১৯৫২ সালে সারাদেশে যখন ভাষা আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে তখন তিনি বিএ পরীক্ষার্থী। যশোর শহরে তখন প্রতিদিন মিছিল মিটিং চলতে থাকে। এসব কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন আলমগীর সিদ্দিকী ও তৎকালীন এমএম ছাত্র সংসদের জিএস শরীফ হোসেন। খান জিয়াউল হক তখন কলেজ থেকে ছাত্রদের নিয়ে মিছিল মিটিংয়ে যোগ দিতে থাকেন। যেহেতু তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন তাই তাকেডেকে পাঠানো হলো পার্টি অফিসে। তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ সরাসরি জানিয়ে দিল ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাদের আপত্তির কথা। খান জিয়াউল হক কলেজে তার অনুসারিদের নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিলেন তারা আর মুসলিম ছাত্রলীগ করবেন না। 

এরপর সাধারণ ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে এমএম কলেজ ক্যাম্পাসে একটি বিশাল মিছিল বের করেন। এই মিছিলে তার সাথে নেতৃত্বে ছিলেন শরিফ হোসেন। এসমসয় মিছিল নিয়ে শহরে যাওয়ার চেষ্টা করলে বেশ কয়েকবার পুলিশ তাদেরকে বাধা দেয়। মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দ প্রবল চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালায়। ১৫ ফেব্রুয়ারির দিকে তিনি বন্ধুদের পরামর্শে নিজ বাড়ি মাগুরায় চলে আসতে বাধ্য হন। মাগুরায় ফিরে আসার পর তিনি যুক্ত হন মাগুরার আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে। সেই সময়কার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তখনো মাগুরায় তেমন কোন আন্দোলন হয়নি। আবু মিয়া সংগঠিত করছিলেন সবাইকে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঘটনা জানতে পেরে আমরা পরদিনইমাগুরার সংগঠক নাসিরুল ইসলাম আবু মিয়ার সাথে দেখা করি । সেখান থেকেই ঠিক করা হয় যে, ২৩ ফেব্রুয়ারি মিছিল ও সমাবেশ করা হবে। ২৩ ফেব্রƒয়ারি সকালেই সবাই সেগুন বাগিচায় একত্রিত হই। সেখানে আবু মিয়ার সভাপতিেেত্ব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে আমরা মিছিল নিয়ে এগিয়ে চৌরঙ্গী মোড়ে আসতেই পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।অন্যরা নিরাপদ স্থানে সরে গেলেও আমি, জলিল খান এবং চান্দু মিয়া পুলিশের হাতে ধরা পড়ি। আমাদেরকে পার্শ্ববর্তী জিআরও অফিসে বসিয়ে রাখা হয়। 

খান জিয়াউল হক মাগুরার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক সুপরিচিত নাম। মাগুরার অসংখ্য শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বাংলাদেশে স্কাউটসের ‘সর্বোচ্চ সম্মান রৌপ্য ব্যাঘ্র’, জাতীয় সমাজসেবা পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, নরেন বিশ্বাস পদক, গোলাম মুস্তাফা আবৃত্তি পদক, জেলা শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা, উদীচী কর্তৃক হরিশ দত্ত নাট্য পদক, থিয়েটার ইউনিট পদক, আব্দুল হক স্বর্ণপদকসহ জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অসংখ্য পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।