• রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৪ রাত

বহিরাগত ও অনাবাসিকদের দখলে বেরোবি'র আবাসিক হলগুলো

  • প্রকাশিত ০২:৫৮ দুপুর ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৯
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

বার বার জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি আবাসিক হলের দু'টিই বহিরাগত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের দখলে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বরাদ্দ পাওয়া সত্বেও শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর ধরে আবাসিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে বসবাসকারীরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে হলের প্রভোস্টও তাদের কাছে জিম্মি। হল প্রশাসনের কোনও নির্দেশ দখলদাররা পরোয়া করছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে। 

সূত্র আরও জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও শহীদ মুখতার ইলাহী হলে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্যেই সেখানে অবস্থান করে মাদক সেবন করে আসছে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা। প্রশাসনকে বার বার জানানো হলেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন দফতর সূত্রে জানা গেছে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ৩টি আবাসিক হল রয়েছে। এর মধ্যে মেয়েদের হলশেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে আবাসন সংক্রান্ত সমস্যা না থাকলেও ছেলেদের দু'টি হলে দীর্ঘদিন ধরে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রলীগ নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় হলের অধিকাংশ বৈধ শিক্ষার্থীকে বিভিন্নভাবে বের করে করে দিয়ে অবৈধভাবে হলের সিটগুলো দখল করে সেখানে অবস্থান করছে বহিরাগত এবং অনাবাসিক ছাত্ররা। বরাদ্দ পাওয়া শিক্ষার্থীরা হলে উঠতে গেলে চরম হয়রানি ও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। গত দুই বছরে অন্তত দেড় শতাধিক বৈধ শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে আহত করেছে দখলদাররা। 

সম্প্রতি শহীদ মুখতার ইলাহি হলে বরাদ্দ পাওয়া দৈনিক সংবাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আল আমিন হোসেন তার সিটে দীর্ঘ দিন চেষ্টা করেও উঠতে না পেরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তুষার কিবরিয়া ও হল শাখার সভাপতি হাসান আলীর কাছে ধর্না দিয়ে অবশেষে তাদের সঙ্গে নিয়ে হলে বরাদ্দ পাওয়া ৫০৬ নম্বর কক্ষে উঠতে গেলে তাকে ওই নেতাদের সামনেই দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। 

পরে আল আমিন ও দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সৌম্য সরকার হলে গেলে তাদেরকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে সন্ত্রাসীরা। আল আমিনকে শ্বাসরোধ করে হত্যারও চেষ্টা করে ছাত্রলীগ নামধারী ক্যাডার জয়ের ও তার বাহিনী। 

প্রতিবাদে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুই দফা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা। ঘটনার পর তাজহাট থানায় একটি মামলাও (নম্বর- ২) দায়ের করে সংবাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আল আমিন হোসেন। 

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কাজই শুরু করেনি সেই কমিটি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৭ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হল এবং একই বছরের ২৮ অক্টোবর শহীদ মুখতার ইলাহী হল উদ্বোধন করা হয়। ওই বছর মেধার ভিত্তিতে দুই হলে প্রায় ৭শ’ শিক্ষার্থীকে আবাসিক সুবিধা দেয় কর্তৃপক্ষ। 

এরপর থেকেই হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বরাদ্দ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মারধরসহ বিভিন্নভাবে হল থেকে বের করে দেয় ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা। কাগজ কলমে হল দুটিতে প্রায় ৪শ’ আসন ফাঁকা থাকলেও বাস্তবে আসন সংখ্যার চেয়ে সেখানে অবৈধভাবে অবস্থানকারীর সংখ্যা দ্বিগুণ। 

সবশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শহীদ মুখতার ইলাহী হলে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়।তবে, অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা আসন না ছাড়ায় নতুনভাবে আবাসিক সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই হলে উঠতে পারেননি। বর্তমানে ওই হলের মোট ২শ’৪০টি আসনে অর্ধেকেরও কমশিক্ষার্থী বৈধভাবে অবস্থান করছেন। বাকি সিটগুলো দখল করে আছে ছাত্রলীগ নামধারীরা। 

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু হল সূত্রে জানা যায়, ওই হলে ৩শ’৫৫টি আসনের মধ্যে মাত্র ৩২ জন বৈধভাবে অবস্থান করছেন। আর নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া ৬৯ জনের মধ্যে ২৩ জন ছাত্রলীগ নেতাদের 'ম্যানেজ' করে সেখানে অবস্থান করছে। বাকি সিটগুলো এখনও অবৈধ দখলদারদের হাতে রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হলে উঠতে হল প্রশাসনের কোনও অনুমতির দরকার হয়না। কয়েকজন ছাত্রনেতার আনুকূল্যে আসন প্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিলেই হলে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, তারা ভর্তির সময় আবাসিক ফি জমা দিয়েও আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন না। 

এদিকে, হলগুলোতে বৈধ শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় হলের ফান্ডও শুন্য হয়ে গেছে। এতে, ৪/৫ মাস ধরে মাসিক বেতন বঞ্চিত রয়েছে প্রায় ২৫ জন কর্মচারী। বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। 

এ বিষয়েবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের কর্মচারী বেল্লাল হোসেন বলেন, হল থেকে যে বেতন দেয় তার ওপর আমার পরিবার নির্ভরশীল। দীর্ঘ ৪ মাস বেতন না পাওয়ায় পরিবারকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এ সমস্যার সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট (চলতি দায়িত্ব) তাবিউর রহমান প্রধান বলেন, যাদের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছে অথবা ছাত্রত্ব নেই তাদেরকে হল ছাড়ার জন্য ইতোপূর্বে তিনবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী এ নির্দেশনা মানলেও বাকিরা অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছে। 

তিনি আরও বলেন, গত সপ্তাহে সর্বশেষ একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে ৭ দিনের মধ্যে অবৈধভাবে অবস্থান করা অনাবাসিকদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা এ নির্দেশ অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অপরদিকে, শহীদ মুখতার এলাহী হলের প্রভোস্ট ফেরদৌস রহমান জানান, অনাবাসিকদের কারণে নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যথাযথ পদক্ষেপ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। 

তিনি আরও বলেন, অনাবাসিকদের কারণে দীর্ঘ ৫ মাস থেকে হলের কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। 

এদিকে, হলগুলোতে মাদক ও অস্ত্রের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই মহিবুল ইসলাম জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া হলে রেইড দেওয়া সম্ভব না। তাই এ ব্যাপারে পুলিশের কিছুই করার নেই।