• রবিবার, মে ২৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫৭ রাত

গাজীখালি নদী যেন বর্জ্যের ড্রেন!

  • প্রকাশিত ০৯:০০ রাত ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯
ধামরাইয়ের গাজীখালি নদী
ধামরাইয়ের গাজীখালি নদী। একসময়ের খরস্রোতা এই নদীটি খননের অভাবে হারিয়েছে স্রোত। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

একসময় খরস্রোতা থাকলেও খননের অভাবে নদীর গভীরতা সমান্তরাল জমি থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে। এরই মধ্যে নদীটিতে তীরবর্তী ওষুধ এবং চামড়া পরিশোধন কারখানার বর্জ্য ফেলার প্রক্রিয়া চলছে

ঢাকার ধামরাইয়ের গাজীখালি নদী। আর এসব কারখানার ড্রেনের কারণে পুরো নদীই যেন পরিণত হয়েছে বর্জ্যের ভাগাড়ে। এসবের পেছনে কারখানাগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দুষছেন এলাকাবাসী।

সম্প্রতি দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়কে রক্ষার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে ‘আইনগত অভিভাবক’ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে নদী রক্ষা কমিশন যাতে নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেজন্য আইন সংশোধন করে ‘কঠিন শাস্তির’ ব্যবস্থা করতে বলা হয় সরকারকে। 

জীবন্ত সত্তা হিসেবে মানুষ যেমন সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে,  নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' ঘোষণা করায় নদীর ক্ষেত্রেও তেমন কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হবে বলে উল্লেখ করেন আদালত।

রায়ে বলা হয়েছে, জাতীয় বা স্থানীয়- ১. নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের নামের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ২. নদী বা জলাশয় দখলকারী বা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীরা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবেন না। ঋণ দেয়ার সময় আবেদনকারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আছে কি না তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৩. কোনো ধরনের নির্বাচনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে নদী দখল বা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ থাকলে তাকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে গাজীখালি নদীতে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর বারবাড়ীয়া-চারিপারা অংশে সরকারি সড়কের নিচ দিয়ে নদীতে কারখানার বর্জ্য ফেলার ড্রেন বানানো হচ্ছে। জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানান, ওষুধ প্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালসের বর্জ্য নদীতে ফেলার জন্যে এই ড্রেন তৈরি করা হচ্ছে। 

নির্মাণ করা হচ্ছে ড্রেন। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনএকই দৃশ্য দেখা গেছে মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বে নদীর মানিকগঞ্জ সীমানা অংশে রাইজিং গ্রুপের চামড়ার কারখানার বর্জ্য নির্গমন ড্রেন। সেখানে ড্রেন থেকে নোংরা পানি সরাসরি যাচ্ছে নদীতে। এই ড্রেন থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার বর্জ্য নির্গত হয় বলে জানান এলাকাবাসী। এতে পানি, বাতাসসহ পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী, পরিশোধন ছাড়াই নদীতে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ হলেও তরল বর্জ্য বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেয়ায় নদীর পানি যেমন দূষিত হচ্ছে। খাল-বিল ও জলাশয় পরিণত হয়েছে বিষের খনিতে।

ওই এলাকার বাসিন্দা মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী বাবুল হোসেন বলেন, একসময় এই নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বহু পরিবার নদীকে কেন্দ্র করেই জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্ত কোম্পানির বর্জ্যের কারণে নদীজুড়ে এখন নোংরা পানি। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। তাই এই পানিতে এখন কোনো জলজ প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। কচুরিপানাও কয়েকদিনেই মরে যায়। মাছ একেবারেই নেই। এসব পানি গায়ে লাগলে খোস-পাঁচড়া হয়ে যায়।

একই তথ্য জানালেন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, এই নদীতে একসময় ছোট জাহাজ চলতো, নৌকা-ট্রলার চলতো। কিন্তু পলি জমে নদী ভরাট হয়ে গেছে এখন। আবার কোম্পানিগুলোর ময়লার কারণে পানি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন এই পানি গায়ে লাগলে চর্মরোগ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে ধামরাই নদী বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বলেন,  ধলেশ্বরী নদীর শাখা নদী এই গাজীখালি। ধামরাইয়ের বংশাই নদীর মতো এই নদীও হুমকির মুখে আছে। নদীজুড়ে বিভিন্ন কোম্পানির বর্জ্যের ড্রেনের ফলে নদী দূষিত।

গাজীখালি নদীতে ফেলা হচ্ছে কারখানার বর্জ্য। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনতিনি নদী রক্ষায় আদালতের রায় উল্লেখ করে বলেন, কোর্টের ঘোষণা অনুযায়ী নদ-নদীগুলো এখন থেকে মানুষ বা প্রাণী যেমন কিছু আইনি অধিকার পায় তেমনি অধিকার পাবে। কিন্তু প্রশাসন এখানে নদী রক্ষায় ভূমিকা রাখছে না। এখনে প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব কাজ হচ্ছে। প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় প্রতিবাদ জানিয়েও তাদের টনক নাড়ানো যাচ্ছে না। এসব কাজের সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জড়িত আছে। সুস্থভাবে বাস করার জন্যে অপরিহার্য এসব নদী দূষণ রোধে দায়িত্বশীলরা এগিয়ে আসছে না, ফলে এই দূষণ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ড সদস্য আবুল বাসার মন্টু বলেন, কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। বারবার প্রশাসনকে জানানো সত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি তারা। বড় কোম্পানিগুলোর কাছে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি, তারা যা খুশি করলেও আমরা কিছুই করতে পারিনা।

নদী দূষণ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাদের মোল্লা এবিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে ড্রেন তৈরিকারী কোম্পানী ইনসেপটার সাথে যোগাযোগ বলেন।

জানতে ইনসেপটা ফার্মার ধামরাই প্রজেক্টে বারবার ফোন করা হলেও দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল এবং বাচ্চাদের ডায়াপার প্রজেক্টের বর্জ্য এই ড্রেন দিয়ে ফেলা হবে। 

তিনি বলেন, স্থানীয় লোকজনকে 'ম্যানেজ করেই' প্রজেক্ট করা হয়েছে। এর সঙ্গে অনেকেই জড়িত আছেন।

নদী দূষণ প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যক্রম ও গাজিখালির দূষণ বন্ধে করণীয় জানতে চাইলে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমি এই বিষয়টি অবগত নই। তবে এমন ঘটনা ঘটালে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।