• শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৪ সকাল

লিটন নন্দী: প্রশাসন একধরনের প্রভু, আর ছাত্ররা যেন দাস

  • প্রকাশিত ০৯:৩১ রাত মার্চ ৫, ২০১৯
লিটন নন্দী
ডাকসু নির্বাচনের অন্যতম ভিপি প্রার্থী বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী। ছবি: ফেসবুক থেকে নেয়া

ডাকসু নির্বাচনে আলোচনার শীর্ষে থাকা সহ-সভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থীরা ঢাকা ট্রিবিউনকে দিয়েছেন বিশেষ সাক্ষাৎকার। প্রথম কিস্তিতে প্রকাশিত হলো বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী'র সাক্ষাৎকার। 

দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামী ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত এবারের ডাকসু নির্বাচনে মোট ২২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে আলোচনার শীর্ষে থাকা সহ-সভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থীরা ঢাকা ট্রিবিউনকে দিয়েছেন বিশেষ সাক্ষাৎকার। প্রথম কিস্তিতে প্রকাশিত হলো ঢাকা ট্রিবিউন সাংবাদিক আহমেদ সার্জিন শরীফকে দেয়া বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী'র সাক্ষাৎকার। 

ঢাকা ট্রিবিউন: সমসাময়িক আন্দোলনগুলোতে অংশ নিয়ে আপনি ক্যাম্পাসে নিজের একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রেখেছেন। তবে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে কতটা এগিয়ে থাকতে পারবেন বলে মনে করেন?

নন্দী: প্রথমতঃ ডাকসু শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলে। গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে বোঝায় ক্যাম্পাসে ভিন্নমত পোষণকারী কারও ওপর রড, হাতুড়ি, হেলমেট নিয়ে আক্রমণ করা হবে না। কিন্তু যে সংগঠনের বিরুদ্ধে পেশীশক্তির ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যারা ছাত্রদের ওপর রড-হাতুড়ি নিয়ে আক্রমণ করে তারা আবার কোন অধিকারে ভোট চাইবে? দ্বিতীয়তঃ ডাকসু প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার একটি প্ল্যাটফর্ম। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আবদ্ধ করে রেখেছে শিক্ষার্থীদের। আর ছাত্রলীগও প্রশাসনের লেজুরবৃত্তি করে। বিপরীতদিকে আমরা প্রশাসনের এমন আচরণের বিরোধিতা করে আসছি। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলো সবসময় শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে, বিপরীত দিকে আমরা সব ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছি, নেতৃত্ব দিয়েছি। এসব বিবেচনায় নৈতিকভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে আমরা ছাত্রলীগের চেয়ে এগিয়ে রয়েছি।

ঢাকা ট্রিবিউন: সেক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আরেকটি পক্ষের উত্থান হয়েছে। তারাও বিভিন্ন সময়ে নিপীড়নের শিকার। তাদের বিষয়ে কী বলবেন?

নন্দী: কোটা আন্দোলনের সময়ে আমরাও সেখানে যুক্ত হয়েছিলাম। হল থেকে মেয়েদের যখন রাতের বেলা বের করে দেয়া হচ্ছিল তখন আমরা অর্থাৎ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি, তাদের ওপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছি। তারও আগে আমরা যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে হওয়া আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি, গণরুম-গেস্টরুমে নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা নেমেছি। কোটা আন্দোলনকারীরা মূলতঃ একটা দাবিতে আন্দোলন করেছে কিন্তু আমরা সব ইতিবাচক আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বিবেচনা করবে- কোনও মৌসুমি আন্দোলনকারীকে তারা বেছে নেবে, নাকি সবসময়ে তাদের পাশে যারা থাকে তাদেরকে বেছে নেবে। তবে বৃহৎ পরিসরে আমরা সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের অবসান চাই। সেদিক থেকে তাদের সঙ্গে আমাদের নৈতিক ঐক্যমত রয়েছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: নির্বাচনে সহাবস্থানের দাবি জানিয়ে এসেছেন আপনারা। আপনাদের সেই দাবি মেনে নেয়া না হলেও কেন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন?

নন্দী: এই নির্বাচন হচ্ছে সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের একটা ধাপ মাত্র। ডাকসু নির্বাচন মানেই সবকিছু পাওয়া হয়ে গেল, এমন না। কিন্তু এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এক ধরনের জবাবদিহিতামূলক সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। জবাবদিহিতা থাকলে ছাত্রনেতারা গুণগত এবং মেধাভিত্তিক রাজনীতির প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। এসব দিক বিবেচনায় আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কারণে এই নির্বাচন যদি কোনও প্রহসনে পরিণত হয়, সেক্ষেত্রে আমরা ভেবে দেখব শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকব কী থাকব না তা ভাববার অবকাশ রয়েছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: ১৮টি হলেই প্রার্থী দিয়েছেন আপনারা। সেক্ষেত্রে ছাত্রলীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আপনারা। তবে হলে আপনাদের কর্মীরা সেভাবে অবস্থান নিতে পারেনা। কতটা সুবিধে করতে পারবেন?

নন্দী: দেখুন তারা (ছাত্রলীগ) যে বিশাল জমায়েত দেখায় তার একটা বিশাল অংশকেই বাধ্য করা হয়। যখন আপনি ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কারও সিটকে পুঁজি করে, তার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে মিছিলে যেতে বাধ্য করবেন তখন সেই কর্মীটিকে আপনি নিজের কর্মীবাহিনী হিসেবে নৈতিকভাবে দাবি করতে পারেন না। হলগুলোতে ছাত্র সংসদ না থাকার কারণে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন। তাই ইচ্ছা থাকা সত্বেও অনেকে আমাদের রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারেন না। অনেকদিন পর নির্বাচন হচ্ছে, তাই এবার আর শিক্ষার্থীরা ভুল করবেন না। ব্যালটের মাধ্যমে সঠিক প্রার্থীকে বেছে নেবেন তারা।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম সঙ্কটগুলো কী কী?

নন্দী:  আমার চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম সঙ্কট হলো ‘ধারণাগত সঙ্কট’। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য সকল মতামতকে ধারণ করতে পারা, কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় তা পারে না। এখান থেকেই উদ্ভব হয় গেস্টরুম নির্যাতন, অন্যের রাজনীতি কিংবা চিন্তার ওপর আক্রমণ চালানো। তার পরে আসে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়, নামে-বেনামে ফি বাড়ায়, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের তোয়াক্কা না করেই শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, ক্লাসে উপস্থিত হতে বাধ্য করা হয়। ‘প্রশাসন একধরনের প্রভু, আর ছাত্ররা যেন দাস’, প্রশাসন এমনভাবেই শিক্ষার্থীদেরকে বিবেচনা করে। এছাড়াও, বিশ্ববিদ্যালয় এখন বৈষম্য তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ- এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্যান্টিনে বিভিন্ন রকম দামের খাবার পাওয়া যায়, ছেলে এবং মেয়েদের হলে প্রবেশের সময়ে ভিন্নতা রয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় একটি বৈষম্যহীন সমাজ তৈরির কারখানা। এখান থেকেই দেশব্যাপী সাম্যের বার্তা ছড়িয়ে যাবে। এই তিনটি পয়েন্টই আমার চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম সঙ্কট। এছাড়া অনেক সঙ্কট যেমন- লাইব্রেরি, পরিবহন ইত্যাদি প্রাত্যহিক দাবি সবাই-ই করছেন। পাশাপাশি এই তিনটি বড় সঙ্কট দূর না করা গেলে এখান থেকে কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। তবে ডাকসু হয়ে গেলেই সব হয়ে গেলো, বিষয়টা কিন্তু এমন না। ডাকসুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্কটগুলো ছাত্রনেতারা সিনেটে তুলে ধরতে পারেন মাত্র।

ঢাকা ট্রিবিউন: কোটা আন্দোলনকারীরা আপনাদের সঙ্গে জোট করতে চেয়েছিল। তবে শিবির সংশ্লিষ্টতার কারণে আপনারা জোট করেননি।এ তথ্য কতটুকু সত্য?

নন্দী: বিষয়টা ঠিক এমন না। আমরা ১১ দফা দাবি নিয়ে একটি ঘোষণাপত্র ঠিক করেছিলাম। এই ১১ দফা দাবির সঙ্গে যে বা যারা একমত তাদেরকেই আমাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলাম। বৃহত্তর ঐক্যে আহ্বানে আমরা ছাত্রলীগ, ছাত্রদল এবং প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠনগুলো বাদে আমরা সব ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক, আদিবাসী ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেই ধারায় আমরা কোটা আন্দোলনকারীদেরকেও জোটে আহ্বান করেছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের ১১ দফার সঙ্গে একমত হতে পারেননি, তাই জোটে আসেননি। সহজভাবে বলতে গেলে আমাদের ১১ দফার মধ্যে ছিল- সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরোধিতা, সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব-শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান প্রভৃতি। হয়ত তারা এসব দাবির সঙ্গে একমত হতে পারেননি, তাই আমাদের সঙ্গে আসেননি। আমাদের দিক থেকে দরজা খোলা ছিল।

ঢাকা ট্রিবিউন: তাহলে আপনারা তাদের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করছেন না?

নন্দী: আমাদের ১১ দফায় প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের কথাও বলা হয়েছিল। এখন সেই দিক বিবেচনায় যদি কেউ আমাদের সঙ্গে না আসে, তাহলে ধরে নিতে হবে তাদের মধ্যেও সেই সমস্যা রয়েছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: বামজোটের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন ছাড়া অন্যদের অবস্থান সুসংহত না। জোট করে কতটা সুবিধা হবে বলে আপনার মনে হয়?

নন্দী: আমরা মনে করি ন্যূনতম কর্মসূচিতে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন।দলীয় সংকীর্ণতায় নিমজ্জিত থেকে বৃহত্তর ঐক্য গড়তে না পারলে সেটা দীর্ঘমেয়াদী সফলতা বয়ে আনে না। তাই বামপন্থীদের বৃহৎ ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের ওপরই অন্য সব বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোকে একীভূত করার দায়িত্ব বর্তায়। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা শুধু ডাকসুতেই নয় সর্বক্ষেত্রে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোকে একীভূত করার চেষ্টা চালিয়ে যাব। এই জোট কেবল একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই নয়, বরং বৃহত্তর পরিসরে সুফল বয়ে আনবে বলে আমি মনে করি।

ঢাকা ট্রিবিউন: ডাকসু নির্বাচন হয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রয়োজনীয়তা আছে কি?

নন্দী: দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলে গেছেন, প্রতিটি মানুষই একটি রাজনৈতিক জীব। অর্থাৎ আপনি পছন্দ করেন অথবা না-ই করেন, রাজনীতি আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব সঠিক রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্ধারণ করা। তাই আমি মনে করি, রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সেদিনই শেষ হবে যেদিন ছাত্রদের আর নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে হবে না। তাছাড়া, প্রতিটি ঘটনারই একেকটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। তাই বর্তমান সময়ে এসে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গিয়েছে। কারণ এখন শিক্ষার্থীরা রাজনীতি বিমুখ। এই যে রাজনৈতিক বিমুখতা, এটাও এক ধরনের রাজনীতি। তাই শিক্ষার্থীদের সঠিক, মেধাভিত্তিক এবং আদর্শিক রাজনীতির ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।