• সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১৮ দুপুর

'পুলিশ কি তোর বাপ-দাদার কেনা গোলাম, ডাকা মাত্র হাজির হবে'

  • প্রকাশিত ০৫:১৪ সন্ধ্যা এপ্রিল ৩, ২০১৯
ওসি হাবিল হোসেন
ওসি হাবিল হোসেন

ওসি ভুক্তভোগীকে আরও বলেন, ‘ওপর মহলে নালিশ করিস, তোর মামলা হবে না। কোর্টে মামলা কর।’

‘পুলিশ কী তোর বাপ-দাদার কেনা গোলাম, ডাকা মাত্র পুলিশ তোর বাড়িতে হাজির হবে’-সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিল হোসেন সাহায্য চেয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হওয়া ফজলুল করীম নামের এক ব্যক্তিকে একথা বলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 

ফজলুল সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের সোরা গ্রামের আবুল কাশেম সরদারের ছেলে। তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

ওসি হাবিল বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ এনেছেন ফজলুল। ফোনে 'দুর্ব্যবহার' ছাড়াও ওসি হাবিল প্রথমে তার মামলা নিতে চাননি বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। পরে তিনি এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করেন।  

গতকাল মঙ্গলবার রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানিতে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মামলা নেওয়ার আদেশ দেন।

হাইকোর্টে রিট আবেদন করে ফজলুল করীম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে রমজাননগর ইউনিয়নের সোরা গ্রামের বাড়িতে আসি। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ দেওয়াল ভাঙার শব্দ হয়। এতে আমরা ভীত হয়ে পড়ি। বাইরে এসে দেখি বেশ কয়েকজন লোক হাতুড়ি দিয়ে আমাদের দেওয়াল ভাঙচুর করছেন। তখন বাড়িতে আমি এবং আমার বাবা-মা ছিলাম। ডাকাত ভেবে চিৎকার করতে থাকি। কেউ এগিয়ে না আসলে শ্যামনগর থানার ওসি স্যারের কাছে সাহায্য চাইলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান।' 

"পরে আবারও আমি ওসি স্যারকে বলি, ‘স্যার আমাদের বাড়িতে ডাকাত পড়েছে।' তখন ওসি স্যার আমাকে বলেন, 'পুলিশ কি তোর বাপ-দাদার কেনা গোলাম? ডাকা মাত্র পুলিশ তোর বাড়িতে হাজির হবে।'’’

ফজলুল আরও বলেন, ‘এরপর কালীগঞ্জ সার্কেলের এএসপিকে ফোনে বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি ৯৯৯-এ ফোন করে সাহায্য চাইলে শ্যামনগর থানার একজন এএসআই ঘটনাস্থলে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে হামলাকারীরা ২ লাখ টাকা, ৮০ হাজার টাকা মূল্যের দুটি সোনার চেইন ও ৫০ হাজার টাকার মালামাল লুট করে। যাওয়ার সময় তারা বাড়ির সীমানা প্রাচীরও ভেঙে ফেলে। হামলাকারীরা আমাকে এবং আমার বাবা-মাকে মারধর করে পালিয়ে যায়।' 

তিনি জানান, পরে ঘটনাস্থল থেকে ওসিকে ফোন করে ফজলুলকে কথা বলতে বলেন ওই এএসআই। ওসি তখন ফোনে ফজলুর করিমকে বলেন, ‘ওপর মহলে নালিশ করিস, তোর মামলা হবে না। কোর্টে মামলা কর।’ পরদিন এসআই মরিুজ্জামান ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে বলেন, ‘মামলা হবে না। পারলে চেয়ারম্যানের সঙ্গে বসে মীমাংসা করে নিতে হবে।’ কিন্তু তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারের কাছে সব ঘটনা জানিয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে শ্যামনগরের ওসি হাবিল হোসেন বলেন, ফজলুল করিমের বাবা আবুল কাশেম সরদারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকাল ১০টায় ১০ জনসহ মোট ১৫ জনেক আসামি করে ডাকাতির মামলা নেওয়া হয়েছে। মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন-ইউসুফ, আয়ুব হোসেন, শমসের, রেজাউল, নাদির সরদার, রফিসহ  ১৫ জন। এই আসামির মধ্যে আবুল কাশেম সরদারের একজন আপন ভাই এবং একজন সৎ ভাই রয়েছেন। 

এর আগে মামলা মামলা না নেওয়ার বিষয়ে ওসি হাবিল বলেন,  ফজলুল করিমের বাবা আবুল কাশেম সরদারের আপন ভাই ও সৎ ভাইদের সঙ্গে জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে চলে আসছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে জমি নিয়ে মারামারি এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তখন ফজলুল শ্যামনগর থানায় অভিযোগন করেন-তার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ওই রাতের মূল ঘটনা নিয়ে মামলা করার জন্য বলা হলেও তিনি ডাকাতির মামলা করতে চান। 

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা তদন্ত সাপেক্ষে মামলা নিতে চেয়েছিলাম। জমা-জমা নিয়ে দ্বন্দ্ব সেটাকে তারা মিথ্যা ডাকাতির মামলা করতে চেয়েছিলেন। সেজন্য তাদের প্রাথমিকভাবে মামলা না নিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে বসে মীমাংসা করে নিতে বলা হয়েছিল।' 

'ওই রাতে ফজলুল করিম সাহেব আমাকে ফোন করা মাত্র আমি এএসআই মনিরুজ্জামানকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছিলাম। পরে দিনও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে। কিন্তু বাদীদের যে অভিযোগ ছিলে সেটা সত্য ছিলো না। সে কারণে মামলা গ্রহণ  করা হয়নি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটা সঠিক নয়।' 

সর্বশেষ ডাকাতির মামলা রেকর্ড করার বিষয়ে ওসি বলেন, ডাকাতির মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

গতকাল সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানায় মামলা না নেওয়ায় অভিযোগে দায়ের করা রিটের শুনানিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেন, ‘ওসি সাহেবরা সব জায়গায় কোর্ট বসিয়ে দেন। ওসি কি সালিশ করতে বসেছেন? তারা সুবিধামতো হলে মামলা নেবেন, অথচ টাকা ছাড়া থানায় একটা জিডিও হয় না।’ 

শ্যামনগর থানায় মামলা না নেওয়ার প্রসঙ্গে আদালত বলেন, ‘ওসি মামলা নিলেন না কেন? আমরা রুল দিয়ে দেখি কেন তিনি মামলা নিলেন না।’ এরপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওসিরা যেখানে সেখানে কোর্ট বসায়, রাতে কোর্ট বসায়। এতো সাহস তারা কোথায় পায়? তারা নিজেরা বিচার বসায় কীভাবে?’ 

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সুপার (এসপি) শ্যামনগর থানার ওসিকে  দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে লিখিত নির্দেশ দেন। এরপরও ওসি কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় হাইকোর্টে ৩ মার্চ রিট আবেদন করেন ফজলুল করিম। পরে ১০ মার্চ প্রাথমিক শুনানি শেষে বিষয়টি খোঁজ নিতে মৌখিক নির্দেশ দেন আদালত।