• রবিবার, মে ২৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৪ সকাল

গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না: টিশার্ট যেভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠলো

  • প্রকাশিত ০৪:৫২ বিকেল এপ্রিল ১১, ২০১৯
গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না
গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না স্লোগান সম্বলিত টিশার্ট গায়ে এক মডেল। বিজেন্স

কীভাবে একটি টিশার্ট পরিণত হল ক্যাম্পেইনে আর কীভাবেই বা এ নিয়ে এত বিতর্ক তৈরি হলো তা নিয়ে এই টিশার্টের নকশাকারী ২৯ বছর বয়স্ক উদ্যোক্তা জিনাত জাহান নিশা কথা বলেছেন ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে

শুরুটা হয়েছিল অনলাইন ভিত্তিক পোশাক ও অলঙ্কার তৈরির প্রতিষ্ঠান বিজেন্স'র "গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না" লেখা টিশার্ট বের করার পরপরই।

এসব টিশার্ট পরা মডেলদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পরপরই এর পক্ষে -বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় চলতে থাকে। এর মধ্যে কিছু ইন্টারনেট ব্যবহারকারী টিশার্টের মূল লেখা এডিট করে কিছু অশালীন শ্লোগান সম্বলিত ছবিও ছড়িয়েছেন।

কীভাবে একটি টিশার্ট পরিণত হল ক্যাম্পেইনে আর কীভাবেই বা এ নিয়ে এত বিতর্ক তৈরি হলো তা নিয়ে এই টিশার্টের নকশাকারী ২৯ বছর বয়স্ক উদ্যোক্তা জিনাত জাহান নিশা কথা বলেছেন ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে।

আপনি কী ভেবেছিলেন যে টিশার্টটি এতটা সাড়া পাবে?

ভাইরাল হওয়ার কোনও ইচ্ছা আমার ছিল না। আমরা যখন পণ্যটা ছাড়ি তখন এরকম কোনো ইচ্ছা আমাদের মনে ছিল না। আমার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ। আমি যা চেয়েছি তা হলো গণপরিবহনে যাতায়াতকারী নারীদের শরীরে যারা অযাচিতভাবে হাত দেয় বা হয়রানি করে তাদেরকে একটি শক্তিশালী মেসেজ দেওয়া।

এটি এত মানুষের রোষের কারণ কেন হলো বলে মনে করেন?

কিছু মানুষের চেহারা প্রকাশ হয়ে পড়েছে বলে তারা মনে করেছেন। মেসেজটিতে তারা নিজেদেরকেই দেখেছেন। অনেক নারীই গণপরিবহণে যৌন হেনস্তার শিকার হলে সংকোচে বলতে পারেন না। যারা এই টিশার্ট নিয়ে সমালোচনা করছেন তারা আসলে এটা বুঝতেই পারছেন না যে কেন নারীদের উচিত এ ধরণের নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। কেউ কেউ বলছেন ঢাকার পাবলিক বাসগুলোতে যেমন ভীড় থাকে সেখানে গা ঘেঁষে দাঁড়ানোটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু শরীরে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত স্পর্শের পার্থক্য একমাত্র নারীরা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না। 

সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে আপনি কী বলতে চান?

আমি চাই আমার মেসেজটা সবাই শুনু। গণপরিবহণে হয়রানির বিরুদ্ধে আমরা জোর প্রতিবাদ করতে পারছি না। আমি বলছি না যে এই টিশার্ট একেবারে জাদুর মতো কাজ করবে এবং অযাচিত স্পর্শ থেকে আমাদের রক্ষা করবে। এটা বরং প্রতিবাদের একটি ভাষা। সমালোচনা না করে তাদের উচিত আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে নজর দেওয়া। তারা কেন ফেনীর সেই মেয়েটির বিষয়ে কথা বলছে না যে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে? 

এই বিতর্ক কি আপনার ব্যবসায় কোনো প্রভাব ফেলছে?

হ্যাঁ। এটি আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত উভয় জীবনেই প্রভাব ফেলছে। পহেলা বৈশাখ প্রায় চলে এসেছে। আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমার প্রথম কাজ এখন পণ্যগুলো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এই পুরো বিষয়টি আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। সবসময় আমাকে এখন ফোনে বা অনলাইনে মানুষজনের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে। 

টিশার্টটি কি শুরু থেকেই ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে ছিল নাকি ক্যাম্পেইন হিসেবে ছিল?

আমি সাধারণত ঐতিহ্যবাহী পোষাক যেমন শাড়ি, কুর্তি এগুলো নকশা করে বিজেন্সের পেজের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকি। কিন্তু এই টিশার্টটি পাবলিক বাসে মেয়েদের হয়রানি করার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ ও আন্দোলন। আমার নিজের তিক্ত এক অভিজ্ঞতা থেকেই এই আইডিয়া আমার মাথায় আসে। 

এ সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত বলুন

গত বছর বাসে আমি এক ব্যক্তির দ্বারা হয়রানির শিকার হই। যখন আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি, বাসের অনেকেই তার পক্ষে কথা বলে। তারা বলতে থাকে এই বয়সের কোনো লোক এরকম কাজ করতে পারে না। দু'বছর আগে আমি বাসে টের পাই কেউ পিছনের সিট থেকে আমার জামা ধরে টানছে। আমি আতঙ্কিত হয়ে লক্ষ্য করি সেই লোক ব্লেড দিয়ে আমার জামা কাটতে চেয়েছিল। এই ঘটনাই নিয়ামক হিসেবে কাজ করে এবং সবশেষে আমি টিশার্টে এই স্লোগান নিয়ে হাজির হই। আমি জানি আমার এই অভিজ্ঞতা আরও অনেক নারীই ভোগ করেছেন যারা নিয়মিত বাসে চলাফেরা করেন। 

আপনি কি এরকম মেসেজের আরও টিশার্টের নকশা করবেন?

কেন নয়? আমি একজন শিল্পী। আমি আমার কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করি। সারা পৃথিবীতেই সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে টিশার্ট এখন এক বহুল ব্যবহৃত প্রতিবাদের মাধ্যম। মানুষ এখন আমার পেজ থেকে টিশার্টের ছবিগুলো বিকৃত করে বাজে ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে প্রকাশ করছে। সে যাই হোক, এসব নোংরা মন্তব্য আমার সৃষ্টিশীলতায় কোনও প্রভাব ফেলছে না। আমি এরকম আইডিয়া নিয়ে আবারও আসবো যা সমাজকে ঝাঁকুনি দেবে।