• বুধবার, জুলাই ১৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৩৬ রাত

ভিসির দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতায় অচল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

  • প্রকাশিত ০৬:২৫ সন্ধ্যা এপ্রিল ২০, ২০১৯
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না জানানোর প্রতিবাদ করায় শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলেন উপাচার্য

উপাচার্য (ভিসি) ড. এসএম ইমামুল হকের পদত্যাগের দাবিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন তুঙ্গে। ভিসির অশিক্ষকসুলভ আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়ে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি ২৫ দিনের ব্যবধানে রূপ নিয়েছে তার পদত্যাগের দাবিতে। প্রথমে কেবল শিক্ষার্থীরা সেখানে অংশ নিলেও পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন শিক্ষকদের একটি অংশ।

বিভিন্ন পন্থায় আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়ে গত ১৬ এপ্রিল সোনালী ব্যাংকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হিসাব থেকে অর্থ লেনদেন বন্ধ করে দেন ভিসি। ভিসি স্বাক্ষরিত এক নোটিশে ব্যাংকের কাছে বলা হয়, “আপনাকে (ব্যবস্থাপক) জানাচ্ছি যে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নম্বর (০৩৩৮১১০০০০০০১) ও (০৩৩৮১১০০০০০০২) থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত যাবতীয় অর্থ প্রদান (ইতোপূর্বে প্রদত্ত সব চেকসমূহ) স্থগিত রাখার জন্য নির্দেশ প্রদান করছি।”

ফলে কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংক বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দেবাশীষ চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। কারণ প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা আছে। আমাদেরকেও তো চাকরি করতে হয়। অনেক সাংবাদিকই ফোন করেছেন, কাউকেই কিছু বলতে পারিনি। আপনি প্লিজ ভিসি স্যারকে ফোন করেন।”

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ড. এসএম ইমামুল হকের মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে অন্য একটি নম্বর থেকে কল ব্যাক করে 'আমি ভিসি স্যারের সঙ্গেই থাকি' পরিচয়ে এক ব্যক্তি বলেন, "আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে পরে জানাচ্ছি"।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. সুব্রত কুমার দাস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. মো. হাসিনুর রহমানকে ফোন করা হলে তারাও কোনও সাড়া দেননি।

এদিকে, বুধবার (১৭ এপ্রিল) ভিসি ইমামুল হক ১৫ দিনের ছুটিতে গেছেন বলে খবর বের হয়।

ভিসি ফোনে কথা না বলায় এ বিষয়েও তার কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দায়িত্বশীল শাখার বরাত দিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, “উপাচার্যের করা ১৫ দিন ছুটির আবেদনটি মঞ্জুর করা হয়েছে। ১০ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্যক্তিগত কারণে ১৫ দিনের ছুটি চেয়ে আবেদন করেন উপাচার্য এস এম ইমামুল হক। উপাচার্যের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হাসিনুর রহমান এই ছুটির আবেদন করেন।“

প্রসঙ্গত, গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না জানানোর প্রতিবাদ করায় শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলেন উপাচার্য। তার ওই বক্তব্যের পর ২৮ মার্চ থেকে ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন তারা। ওইদিনই ক্লাস-পরীক্ষা এবং আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে ওইদিনই ভিসির পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

তবে, ভিসির প্রতি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এমন ক্ষোভ একেবারে একদিনের নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমামুল হকের বিভিন্ন নিয়ম লঙ্ঘন ও দুর্নীতির কথা জানিয়েছেন ঢাকা ট্রিবিউনকে।

শিক্ষকদের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, তারই সময়কালের শেষ দিকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের তিন বছরের ম্যান্ডাটরি সার্ভিস দেওয়ার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। যা বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ  ২৯(১) এবং ৪০ পরিপন্থী।

উল্লেখ্য, নিয়মানুযায়ী আগামী ২৭ মে উপাচার্য হিসেবে ইমামুল হকের মেয়াদ পূর্ণ হবে।

এছাড়া, চার বছর ধরে অস্থায়ী লেকচারার পদে চাকরি করার পরেও দুই বছরের প্রবেশন দেওয়া হয়েছে। যা শিক্ষকদের পদোন্নতি বিলম্বিত করবে। পাশাপাশি, জ্যেষ্ঠ্যতা লঙ্ঘন করে একাধিক বিভাগে শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে বরিশাল ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সহকারী অধ্যাপক আবু জাফর মিয়া ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবিধানের আইন মানেন না। উনি নিজের আইনে চলেন।

তিনি জানান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়োগে ভিসি হঠাৎ করে বয়সের ভিত্তিতে চাকরিতে জ্যেষ্ঠ্যতার নিয়মের আবির্ভাব ঘটান। সেখানে এক নম্বরে ছিলেন মনিরা বেগম এবং দুইয়ে ছিলেন শরীফা উম্মে শিরিনা। কিন্তু তিনি ক্রম ভঙ্গ করে বয়সের কারণে শরীফাকে জ্যেষ্ঠ্য দেখিয়ে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেন। এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতি প্রশ্ন করলে ভিসি জানান, এটা এমনিই করা হয়।

এদিকে শনিবারও উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। এদিন বিকাল ৪ টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ সভা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।