• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৪ দুপুর

নুসরাত হত্যাকাণ্ডে ফেঁসে যেতে পারে ফেনীর কারা কর্তৃপক্ষ

  • প্রকাশিত ১০:১৮ রাত এপ্রিল ২৫, ২০১৯
নুসরাত জাহান রাফি
নুসরাত জাহান রাফি। ছবি: সংগৃহীত

জেলে বসেই রাফিকে হত্যার নির্দেশনা দেন সিরাজ উদ দৌলা। কারা কর্তৃপক্ষের কেউ উপস্থিত থাকলে রাফিকে হত্যার পরিকল্পনার কথা তাদের জানার কথা।

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় কারাগার থেকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশনা ছিল। সে অনুযায়ীই রাফিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। আদালতে আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এ তথ্য।

পিবিআই সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কারাবিধি লঙ্ঘন করে আলোচিত আসামি সিরাজের সঙ্গে তার ক্যাডার বাহিনীকে একান্ত সাক্ষাতের সুযোগ করে দেওয়ায় এবার কারা কর্তৃপক্ষ ফেঁসে যেতে পারে।

এছাড়া, সিরাজের সঙ্গে সাক্ষাতের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং তথ্য জব্দ করা না হলে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে সিরাজ মামলা থেকেও বেঁচে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা নুসরাতের স্বজনদের।

কারাগারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, কারাবিধি অনুযায়ী আলোচিত আসামির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় একজন কারারক্ষী বা কারাকর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার কথা। অথচ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে নুর উদ্দিন ও শামীমের সাক্ষাতের সময় কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। 

ফলে দীর্ঘ দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে তাদের কথোপকথন। এ সময় রাফিকে হত্যার নির্দেশনা দেন সিরাজ উদ দৌলা। কারা কর্তৃপক্ষের কেউ উপস্থিত থাকলে এ পরিকল্পনার কথা তাদের জানার কথা। ফলে তাকে পুড়িয়ে মারার মতো এমন ঘটনা ঘটতো নাও ঘটতে পারত বলে সূত্রটি মনে করে।

এদিকে, পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে কারাগারে কোনও আসামির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় কারারক্ষী ছাড়া সাক্ষাৎ করা যায় কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেল কোড সম্পর্কে তার জানা নেই। তবে এসব বিষয়েও তদন্ত চলছে।

নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, রাফির হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনিটরিং করছেন। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানান তিনি।



 
ফেনী জেলা কারাগার। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

এ বিষয়ে ফেনী আদালতের আইনজীবী এডভোকেট শাহ জাহান সাজু ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, কারাগার থেকে সিরাজের নির্দেশে রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় বিধি লঙ্ঘন করায় কারা কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারেনা। তাদেরকেও আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

ফেনী কারাগারের জেলার দিদারুল আলম এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কোনও কিছুই জানা নেই। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে নারাজ তিনি।

পিবিআইর পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম জানান, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম ১৬৪ ধারায় ১৫ এপ্রিল ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাকির হোসেনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা ধরে এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দিতে আদালতে সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশনা ও আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নুর উদ্দিন ও শামীম বর্ণনা করেন।

জবানবন্দিতে নুর উদ্দিন জানান, গত ৩ ও ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে ফেনী কারাগারে দেখা করেন তিনি। সেখানে শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন ছিলো। তারা ‘আলেম সমাজকে হেয় করায় নুসরাতকে ‘একটি কঠিন সাজা দেওয়া’র জন্য সিরাজ উদ দৌলার কাছে হুকুম চায়।

এই সময় শামীম নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দিলে এ প্রস্তাবে সায় দিয়ে সিরাজ উদ দৌলা তার নির্দেশনা দিয়ে বলেন, তোমরা কিছু একটা করো।’ একইসঙ্গে সিরাজ উদ দৌলা এ নিয়ে ‘বেশ কিছু গোপন টিপস’ দেয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নুর উদ্দিন।

নুর উদ্দিন আরও জানায়, সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশনা পাওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল, শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন মাদ্রাসার পাশের পশ্চিম হোস্টেলে বৈঠকে বসে। সেই বৈঠকে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যা ৬ এপ্রিল বাস্তবায়ন করা হয়।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শাহাদাত হোসেন শামীম বলেছেন, সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন তিনি। 

এছাড়া, পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে তারা মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে থাকা টয়লেটে ওঁৎপেতে থাকে। এর আগে এক নারী সহযোগীকে দিয়ে তারা তিনটি বোরকা ও কেরোসিনের ব্যবস্থা করে। আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে তারা উম্মে সুলতানা পপিকে (ছদ্মনাম শম্পা) দিয়ে কৌশলে নুসরাতকে ছাদে নিয়ে আসে। এরপর নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে শামীম জানিয়েছে।

এ ঘটনায় আদালতে ১৬৪ ধারায় আসামি শাহাদাত হোসেন স্বীকারোক্তিমূলক জাবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন জড়িত থাকার কথা। ফলে পরোক্ষভাবে জড়িত থাকায় গত শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সোনাগাজী তাকিয়া রোডস্থ বাসভবন থেকে রুহুল আমিনকে আটক করে পিবিআই। পরদিন শনিবার বিকালে আদালতে গ্রেফতার দেখিয়ে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল) রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয় । 

প্রসঙ্গত, নিহত নুসরাত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে তিনি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যান। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাইয়ের দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড়ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে গত ৮ এপ্রিল ৮ জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। ১০ এপ্রিল মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআই’তে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআই ২৩ জন আসামি গ্রেফতার করে। এর মধ্যে ৮ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ৭ জন রিমান্ডে রয়েছে।