• বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:২২ দুপুর

মুন্নির চিৎকারে 'কাঁদেন' চিকিৎসকও

  • প্রকাশিত ০৪:২৪ বিকেল মে ১১, ২০১৯
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থো-সার্জারি (নারী) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর বেডে মুন্নি চিকিৎসাধীন রয়েছে। ছবি : ঢাকা ট্রিবিউন
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থো-সার্জারি (নারী) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর বেডে মুন্নি চিকিৎসাধীন রয়েছে। ছবি : ঢাকা ট্রিবিউন

চিকিৎসকরা জানান, মুন্নির ডান পায়ের হাটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত নিয়মিত ড্রেসিং করা হয়।

স্কুলে যেতে চায় শিশু রিক্তা আক্তার মুন্নি। উড়ে বেড়াতে চায় চঞ্চল পাখির মতো। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সে বন্দি হয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এই শিশু শিক্ষার্থীর পা সিমেন্টবাহী একটি ট্রলির চাকায় পিষ্ট হয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, মুন্নিকে আরও তিন-চার মাস হাসপাতালে থাকতে হবে। 

লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের উত্তর জাওরানী এলাকার কৃষি শ্রমিক আব্দুল কুদ্দুসের মেয়ে রিক্তা আক্তার মুন্নি। সে উত্তর জাওরানী সন্ন্যাসীর ডাঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৭ এপ্রিল দুপুরে ওই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। সেদিন থেকে এখন পর্যন্ত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থো-সার্জারি (নারী) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর বেডে মুন্নি চিকিৎসাধীন। শয্যাশায়ী থাকার কারণে শারীরিকভাবে কিছুটা শুকিয়ে গেছে সে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, চিকিৎসাধীন মুন্নির পাশে বসে আছেন তার বাবা-মা। রোগীর ভিড়ে মুন্নির চারদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বিভিন্ন রোগীরও চিকিৎসা চলছে। মেয়ের চিকিৎসা কীভাবে করাবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা মুন্নির বাবা কুদ্দুস ও মা রবিলা খাতুন।   

ভেলাগুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মহিরউদ্দিন বলেন, গত ৭ এপ্রিল কাছারীরডাঙার নজর আলী আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে হাতীবান্ধা-দৈখাওয়া-চাপারহাট জিসি সড়কের ওপর মুন্নি সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তাকে উদ্ধার করে স্থানীয়দের আর্থিক সহযোগিতায় দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে। পরিবারটি খুবই দরিদ্র। 

পরিবারটি দেখতে গিয়ে কথা হয় একই এলাকার শামছুদ্দিন-কমর উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবু বক্কর সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অসহায় মুন্নির সুচিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসা উচিত। শিশুটি বাঁচতে ও লেখাপড়া করতে চায়।’

চিকিৎসকরা জানান, মুন্নির ডান পায়ের হাটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত নিয়মিত ড্রেসিং করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থা থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। জয়েন্টগুলো খুলে গিয়েছিল। ফ্রাকচারও হয়েছে। সম্পূর্ণ মাংস উঠে গিয়েছিল। এখন নতুন করে মাংস হচ্ছে। সার্জারি করে চামড়াও লাগাতে হবে। এতে প্রচুর সময় ও খরচের প্রয়োজন। 

অর্থো-সার্জারি নারী ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স সাবিনা ইয়াসমিন এবং ওয়ার্ড বয় মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, যে ধরনের নিরাপদ পরিবেশে চিকিৎসা প্রদান করা প্রয়োজন, তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এত বেশি রোগী আসছে, তাদের জায়গা দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। পাঁচটি পেয়িং বেড ও ১১টি জেনারেল বেডে ১৬জন রোগী থাকার কথা, কিন্তু ৫৯ জন রোগী আছে। 

সহকারী রেজিস্টার চিকিৎসক রায়হান আলী পুরো ওয়ার্ড ঘুরে দেখিয়ে বলেন, ‘সুচিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য ১৬ জন রোগী থাকার কথা। এতো রোগীকে কীভাবে আপনি সামলাবেন। এরপরও আমরা সুচিকিৎসা প্রদানে সাধ্যমতো আপ্রাণ চেষ্টা করছি।’

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘যদি সড়ক দুর্ঘটনা না ঘটে, আপনি এই অর্থো-সার্জারি ওয়ার্ডে কোনো রোগীই পাবেন না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে না পারলে আরও খারাপ অবস্থা দেখতে হবে। দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থাকলে এক সময় রোগীদের মাঝে মরণব্যাধী রোগ ছড়াতে পারে! যদিও বিষয়টি কারোরই কাম্য নয়।’     

মুন্নির প্রধান চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অর্থো-সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্টার মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এখন মুন্নিকে আশঙ্কামুক্ত বলা যেতে পারে। তবে তার ডান পা আগের অবস্থায় না পাওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। তাকে দ্রুত সুস্থ করতে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু আরও কত সময় লাগবে, তা বলা যাচ্ছে না।’

‘মুন্নিকে যখন ড্রেসিং করানো হয়, তখন ওর চিৎকার আমার বিবেককে স্পর্শ করে, আমিও কাঁদি। তাকে আমার মেয়ের আদরে চিকিৎসা করছি। উন্নত চিকিৎসা করানো মুন্নির জন্য বাবা-মায়ের আর্থিক সামর্থ্য নেই।’

মুন্নির বাবা আব্দুল কুদ্দুস কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, কায়িক শ্রম বিক্রি করেই সংসার চলে। মেয়ের চিকিৎসার জন্য সবকিছুই এখন বন্ধ আছে। এক মাসের বেশি হয়ে গেল, কিন্তু তার এখনো সুস্থ হলো না। 

আব্দুল কুদ্দুস আরও বলেন, 'পকেটে টাকাও নেই। ওর চিকিৎসার সামর্থ্য হারাচ্ছি। কেউ একজন পাশে দাঁড়ালে মেয়েটাকে বাঁচাতে পারতাম।’

জানতে চাইলে মুন্নির স্কুলের প্রধান শিক্ষক মজিবর রহমান বলেন, ‘মুন্নিকে বাঁচাতে আমরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছি। মেধাবী এই শিশুটির দুরন্তপনা চোখের সামনে দমে যেতে পারে না। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ স্যারকে অবহিত করা হয়েছে।’