• সোমবার, আগস্ট ২৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৩ সকাল

জাবির ছাত্র-ছাত্রী শৃঙ্খলা অধ্যাদেশের দুটি ধারা নিয়ে তীব্র বিতর্ক

জাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। ছবি: সংগৃহীত

‘নতুন ধারায় শাস্তির বিধান রাখায় সাংবাদিকরা ভয়ে থাকবে। কেননা যারা ক্ষমতায় থাকবেন তারাই সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করবেন। এর ফলে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান বাধাগ্রস্থ হবে।  বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি লাভবান হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হবে। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সর্বত্রই টুটি চেপে ধরা হচ্ছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ হালনাগাদ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংশোধিত অধ্যাদেশে যুক্ত হওয়া নতুন দুটি ধারা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহল ধারা দুটোকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা এবং আইসিটি আইনের অধুনালুপ্ত ৫৭ ধারার সঙ্গে তুলনা করেছেন।    

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্টরা ধারা দুটিকে নিবর্তনমূলক অ্যাখ্যা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতেই ধারাদুটি যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সাংবাদিকতা বাধার মুখে পড়বে বলে সাংবাদিকরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।  

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসূত্র জানায়, ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত এক রায়ের পর্যবেক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শৃঙ্খলা বিধিকে ‘দুর্বল ও সেকেলে’ উল্লেখ করে তা হালনাগাদের পরামর্শ দেয়। শৃঙ্খলা বিধির প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন করতে ওই বছরের ১৬ মে তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেনকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটির হালনাগাদ করা শৃঙ্খলা বিধি গত ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাদেশ হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে।

অধ্যাদেশের ৫ এর ঞ) নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ছাত্র/ছাত্রী অসত্য এবং তথ্য বিকৃত করে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদন স্থানীয়/জাতীয়/আন্তর্জাতিক প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যমে/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ/প্রচার করা বা উক্ত কাজে সহযোগিতা করতে পারবে না। 

৫ এর থ) নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ছাত্র/ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র/ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর উদ্দেশ্যে টেলিফোন, মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ইন্টানেটের মাধ্যমে কোনো অশ্লীল বার্তা বা অসৌজন্যমূলক বার্তা প্রেরণ অথবা উত্যক্ত করবে না। 

অধ্যাদেশ মতে, ধারা দুটির ব্যতয় ঘটলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখে ‘অসদাচরণ’ বলে গণ্য হবে। এ জন্য লঘু শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, সতর্কীকরণ এবং গুরু শাস্তি হিসেবে আজীবন বহিষ্কার, বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার, সাময়িক বহিষ্কার ও পাঁচ হাজার টাকার উর্ধ্বে যে কোনো পরিমাণ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।           

৫ এর ঞ) ধারা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়াকে বলেন, ‘এটি খুবই আপত্তিকর ধারা। শিক্ষকদের জন্যও এটি অবমাননাকর। শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয় মহল থেকে প্রতিবাদ হওয়া উচিৎ।’

৫ এর থ) ধারা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কোন কোন বিষয়বস্তুকে অশ্লীল আখ্যায়িত করা হবে তা সুস্পষ্ট নয়। ফলে অনেক বিষয়কে অশ্লীল বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যতটা না মুক্তচিন্তার জায়গা তার চেয়েও বেশি রেজিমেন্টাল হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতি সামনে আরও বাড়বে। শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা করার, শেখার, বোঝার যে ক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি করে দেওয়ার কথা সেগুলো আরও সংকুচিত হবে।’

ব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, রাষ্ট্রীয় আইন থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদাভাবে মত প্রকাশ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেন, “নতুন ধারায় শাস্তির বিধান রাখায় সাংবাদিকরা ভয়ে থাকবে। কেননা যারা ক্ষমতায় থাকবেন তারাই সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করবেন। এর ফলে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান বাধাগ্রস্থ হবে।  বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি লাভবান হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হবে। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সর্বত্রই টুটি চেপে ধরা হচ্ছে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মাহমুদ বলেন, “সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে বিধি দুটি যুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি, দূর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা সবসময় সোচ্চার। সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করতেই এই উদ্যোগ। অবিলম্বে এটি বাতিল করতে হবে।” 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রাইয়ান বিন আমিন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রাপ্তি অনেক কঠিন। সাংবাদিকরা তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও প্রতিকার পায় না। তথ্য অধিকার নিশ্চিত হলে দমনমূলক ধারার দরকার ছিল না। সাংবাদিকদের চাপে রাখার কৌশল এটি।”

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সহ-সভাপতি অলিউর রহমান সান বলেন, “তথ্যের অসততা বা বিকৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্ধারণ করে দেওয়ায় ক্ষমতার বিরুদ্ধে পর্যালোচনামূলক সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্থ হবে। আর, অসৌজন্যতা-অশ্লীলতা সাংস্কৃতিকভাবে পরিবর্তনশীল এবং প্রেক্ষিতসাপেক্ষ। ফলে নিপীড়নের বদলে অশ্লীলতা ও অসৌজন্যতার দোহাই দিয়ে ধারা প্রনয়ন নিপীড়নকে আড়াল করে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। 

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আমির হোসেন বলেন, “শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সেভাবে পর্যালোচনা করার সুযোগ হয়নি। নতুন বর্ষের প্রবেশিকা অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে তাড়াহুড়া করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে সংশোধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পক্ষের আপত্তি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান হতে পারে।”