• বুধবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩২ সকাল

লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের কোটি টাকার ওষুধ হাওয়া!

  • প্রকাশিত ১২:০৯ দুপুর মে ২৮, ২০১৯
লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল
লালমনিরহাট জেলা সদর হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

আমি ফার্মাসিষ্টকে সঠিকভাবে ঔষধ সরবরাহ করেছি। কিন্তু রেজিস্টারে আমার হাতের লেখা কেন এবং ঘষামাজা কেন সেকারণেই আমাকে দোষারোপ করা হচ্ছে। এখন কী হবে বুঝতে পারছি না।

লালমনিরহাট সদর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের স্টোর থেকে ৫০ হাজার জেমিফ্লোক্সাসিন ট্যাবলেটসহ ৩৪ প্রকারের প্রায় কোটি টাকার ঔষধ খোয়া গেছে। এ বিষয়ে গঠিত তিন সদস্যের একটি স্পেশাল সার্ভে কমিটি প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেয়েছে। 

হাসপাতালের গঠিত স্পেশাল সার্ভে কমিটির তদন্তে খোয়া যাওয়া ৩৪ প্রকার ঔষধের মূল্য প্রায় ৩০-৩২ লক্ষ টাকা দাবি করলেও নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র দাবি করছে খোওয়া যাওয়া ঔষধের প্রকৃত মূল্য কোটি টাকারও বেশি। 

জানা গেছে, ওষুধ খোয়া যাওয়ার ঘটনায় হাসপাতালের তত্বাবধায়ক গোলাম মোহাম্মদ চলতি বছরে গত ৩০ এপ্রিল তিন সদস্যের একটি সার্ভে কমিটি গঠন করে দেন। সার্ভে কমিটির প্রতিবেদনের পর গত ২৩ মে স্টোর কিপার সাহেদুল হক ছোটনকে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. অমূল্য চন্দ্র সাহা নীলফামারী ডিমলা ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে একই পদে প্রশাসনিক কারণের কথা উল্লেখ করে বদলির আদেশ দেন। 

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকার ২১২ মিডফোর্ড রোডের মেসার্স বনানী মেডিকেল স্টোর, একই শহরের টিকাটুলির মেসার্স আলেয়া কর্পোরেশন ও ৬০/এ ডিষ্টিলারি রোডের গেন্ডারিয়ার এলাকার মেসার্স জাওয়াদ ড্রাগ হাউস নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে এই হাসপাতালে ঔষধ সরবরাহের ঠিকাদার হিসেবে কার্যাদেশ পায় এবং ঔষধ সরবরাহ করে। এ সময় হাসপাতালের তত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন আবুল ফাত্তাহ মো. আহসান আলী বাবু। তিনি গত ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সালে অবসরে যান। এরপর ডা. হাফিজুর রহমান ২০১৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে একই বছরের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত তত্বাবধায়ক পদে নিযুক্ত ছিলেন। একই বছরের ১১ নভেম্বর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ওই পদে কর্মরত আছেন ডা. গোলাম মোহাম্মদ।    

হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. গোলাম মোহাম্মদ বলেন, “২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ঔষধ ক্রয়ের দরপত্র ২০১৮ সালের জুলাই মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বদলিজনিত কারণে সেই সময়ে দরপত্র করা হয়নি। আমি ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর তত্বাবধায়ক পদে যোগদানের পর দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজে হাত দেই। এ সময় সদর হাসপাতালের ঔষধের স্টক রেজিস্টার ও সরবরাহ রেজিস্টারের মধ্যে অসংগতি দেখতে পাই। প্রকৃত ঘটনা কী সেটা জানতে আমি ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল স্টোর সার্ভে করার জন্য এই হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. মো. আব্দুল বাসেতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেই। গত ২২ মার্চ ওই কমিটি আমাকে ঔষধ স্টকের গড়মিল সংক্রান্ত একটি লিখিত প্রতিবেদন দিয়েছেন। আমি বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের রংপুর বিভাগীয় পরিচালক ডা. অমূল্য চন্দ্র সাহাকে অবহিত করেছি। তিনি গত ২৩ মে স্টোর কিপার মো. সাহেদুল হক ছোটনকে প্রশাসনিক কারণে নীলফামারী জেলার ডিমলা ৫০ শয্যা বিষিষ্ট হাসপাতালের একই পদে স্ট্যান্ড রিলিজ (বদলি) করেছেন।”

ওষুধ খোয়া যাওয়ার বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও সার্ভে কমিটির সদস্য সচিব ডা. মো. আমিনুর রহমান বলেন, “কিছু ঔষধ রেজিস্টারে আছে গোডাউনে নেই। কিছু ঔষধ সরবরাহ দেখানো হয়েছে কিন্তু সরবরাহ করা হয়নি। রেজিস্টারে ঘষামাজা ও অভার রাইটিং করা হয়েছে। এসব বিষয় অধিকতর তদন্ত করে দেখার জন্য রংপুর থেকে একটি তদন্ত কমিটি আসার কথা রয়েছে। তাদের তদন্তে হয়তো বিস্তারিত জানা যাবে।”

জানতে চাইলে লালমনিরহাট সদর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ও সার্ভে কমিটির প্রধান ডা. মো. আব্দুল বাসেত বলেন, “সার্ভেকালে স্টক ও সরবরাহ পর্যালোচনায় ৩৪ প্রকারের ঔষধের গড়মিল পাওয়া গেছে। এরমধ্যে জেমি ফ্লোক্সাসিন, সেফুরাক্সিম ও মন্টিলুকাষ্ট ট্যাবলেটসহ ৩৪ পদের ঔষধের স্টক এবং সরবরাহের সাথে কোনো মিল নেই। টাকার অংকে প্রায় ৩০-৩২ লক্ষ টাকার ঔষধ নেই। অধিকতর তদন্তে এই টাকা বা ঔষধের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।” তবে তদন্তের স্বার্থে তিনি এখনই বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।    

এই বিষয়ে জানতে চাইলে স্টোর কিপার মো. সাহেদুল হক ছোটন ঔষধ সরবরাহ রেজিষ্টার ও স্টক রেজিস্টারের তথ্য গড়মিলের তথ্য স্বীকার করে বলেন, “আমি ফার্মাসিষ্টকে সঠিকভাবে ঔষধ সরবরাহ করেছি। কিন্তু রেজিস্টারে আমার হাতের লেখা কেন এবং ঘষামাজা কেন সেকারণেই আমাকে দোষারোপ করা হচ্ছে। এখন কী হবে বুঝতে পারছি না।”