• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৩১ রাত

হত্যাকারীদের জবানবন্দিতে নুসরাত হত্যার বিবরণ

  • প্রকাশিত ০৯:১২ রাত মে ২৯, ২০১৯
নুসরাত হত্যা মামলা
নুসরাত হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামিরা ঢাকা ট্রিবিউন

আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়ার সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহ আলম আদালতকে এসব কথা জানিয়েছেন।

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় চার্জশিটে অভিযুক্ত ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন হত্যাকাণ্ডে নিজের ও সহযোগীদের ভূমিকা জানিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। 

মামলার প্রধান আসামি সিরাজদ্দৌলা ঘটনার সময় যৌন হয়রানির মামলায় জেলে ছিলেন। তিনি নুসরাত জাহান রাফির গায়ে হাত দিয়েছেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তিনি প্রথমে রাফিকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ এবং রাজি না হলে খুন করার সহযোগীদের নির্দেশ দেন।। তিনিই পুড়িয়ে হত্যার পরামর্শ দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। 

এ নির্দেশের পর বাকি ১৫ জন ১৬৪ ধারায় অধ্যক্ষ সিরাজের বক্তব্য সত্য বলে জবানবন্দি দিয়েছে। জেলখানায় সিরাজ যা বলেছেন একই কথা স্বীকার করেছেন পুলিশ ও আদালতের কাছে।

বুধবার (২৯ মে) দুপুর সোয়া ২টার দিকে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেনের আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়ার সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহ আলম আদালতকে এসব কথা জানিয়েছেন। 

আসামিদের জবানবন্দির বরাতে আদালতে পুলিশের বর্ণনানুযায়ী নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ভূমিকা:

নুর উদ্দিন: হত্যাকাণ্ডের আগে যে কক্ষে বোরখা রাখা ছিল, সেটি পরিদর্শন করে আসেন তিনি। ঘটনার সময় ভবনের নিচে উদ্ভূত পরিস্থিতি চাতুর্যের সঙ্গে সামলে নেন তিনি। ঘটনাটিকে নাটকের মতো চিত্রায়ন করতে সহায়তা করেন।

শাহাদাত হোসেন শামীম: হত্যাকাণ্ডের আগে পরিকল্পনা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শামীম। কে, কীভাবে, কী করবে তার পুরো পরিকল্পনা সাজান তিনি। কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা তিনিই নেন। ওই টাকা দিয়েই বোরখা ও কেরোসিন কেনা হয়। তার জবানবন্দি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরখা ও নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢালতে ব্যবহৃত গ্লাস উদ্ধার করা হয়।

মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর: ঘটনার পর গত ২৮ মার্চ সিরাজের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেন কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে না থাকলে আইসিটি পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার হুমকি দিতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেন। হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি ১০ হাজার টাকা দেন। আগে থেকেই সবকিছু জানলেও ঘটনার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ফেনী শহরে অবস্থান করছিলেন তিনি।

সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের: হত্যাকাণ্ডের সময় নুসরাতকে শোয়ানোর পর পা বেঁধে ফেলেন তিনি। নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢালার পর শামীমের নির্দেশে নিজের সঙ্গে থাকা ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন: তিনি নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢালেন। নুসরাতকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে খুবই ঠাণ্ডা মাথায় পরীক্ষার হলে চলে যান। পরে চিৎকার শুনে ছুটে এসে নুসরাতকে দেখতে যান, এমন ভাব করেন যেন কিছুই জানেন না।

হাফেজ আব্দুল কাদের: তিনি নুসরাতের ভাই নোমানের বন্ধু। ঘটনার সময় মেইন গেটের বাইরে পাহারায় ছিলেন। নুসরাত পরীক্ষার হলে ঠিকমতো পৌঁছেছে কী না। নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানোর কথা শুনে নোমান সেখানে যেতে চাইলে কাদের তাকে বাধা দিয়ে বলেন, দুই মিনিট পর জানাচ্ছি। পরে তিনি নুসরাত গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে বলে জানান।

আবছার উদ্দিন: ঘটনার সময় তিনি গেট পাহারার দায়িত্বে ছিলেন। ঘটনার কিছুক্ষণ আগেও আগের মামলার বাদীকে ফোন করে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন।

কামরুন নাহার মনি: শামীম তাকে ২ হাজার টাকা দিয়ে বোরখা ম্যানেজ করতে বলেন। এ টাকায় ২টি বোরখা ও হাতমোজা কেনেন। কেনা ২টি বোরখাসহ তার নিজের কাছ থেকে একটি মিলিয়ে মোট তিনটি বোরখা ওই ভবনের তৃতীয় তলায় রেখে আসেন। ছাদে ওঠানোর পর নুসরাতকে শুইয়ে ফেলতে সহায়তা করেন এবং বুকের উপর চাপ দিয়ে ধরে রাখেন। ঘটনার পর ঠাণ্ডা মাথায় এসে তিনিও পরীক্ষায় অংশ নেন।

উম্মে সুলতানা ওরফে চম্পা/শম্পা: নুসরাতকে ছাদে ওঠানোর পর মামলা তুলে নিতে প্রথমে চাপ দেন তিনি। রাজি না হওয়ার নুসরাতের ওড়না দুই টুকরো করে দেন, যা দিয়ে নুসরাতের হাত ও পা বাঁধা হয়। নুসরাতের হাত পেছন দিয়ে বাঁধার পর কেরোসিনের গ্লাসটি তার হাতে ধরিয়ে দেয়। যাতে বোঝা যায় নুসরাত আত্মহত্যা করেছে।

আব্দুর রহিম শরীফ: তিনি বাইরের গেটে পাহারায় ছিলেন। নুসরাতের ভাই ভেতরে ঢুকতে চাইলে বাধা দেন তিনি।

ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন ও মহিউদ্দিন শাকিল: তারা গেটে পাহারায় ছিলেন। সবকিছু স্বাভাবিক বোঝাতে যা যা করণীয় তা করছিলেন তারা।

মোহাম্মদ শামীম: তিনি প্রথমে পপির সঙ্গে ভবনটির গেটে পাহারায় ছিলেন। যাতে কেউ সে সময় ভবনে উঠতে না পারে এবং এর ফলে অন্য কাউকে খুন করতে না হয় সেজন্য সতর্ক ছিলেন তিনি।

রুহুল আমিন: ঘটনার পর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে পুলিশ-প্রশাসন সবকিছু ম্যানেজ করার আশ্বাস দেন তিনি। হত্যাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করেন। ঘটনার পর শামীমের সঙ্গে দুই দফা ফোনে কথা বলে সবকিছু নিশ্চিত হন।

চার্জশিট জমা দেওয়ার সময় বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন আদালতে উপস্থিত পিবিআইয়ের চট্রগ্রামের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবালের কাছে এ বিষয়ে জানাতে চাইলে তিনি বলেন, সোনাগাজী সিনিয়র মাদ্রাসার অর্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং যৌন হয়রানির মতো নানা অপকর্মের সঙ্গে ১৬ জনের একে অপরের সঙ্গে প্রত্যেকে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট। তাদের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে নুসরাত প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। সে কারণেই তারা প্রত্যেকে সুচিন্তিতভাবে সুস্থ মস্তিষ্কে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল বলেন, ১১ এপ্রিল কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে গ্রেপ্তারের পর ১৩ তারিখেই তারা জানিয়েছিলেন যে এটি ছিল একটি খুন। ১৬ জনকেই বিভিন্ন দফায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বেশি তিন দফায় রিমান্ডে ছিল শাহাদত হোসেন শামীম।

এ ঘটনায় পাঁচটি বোরকা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর মধ্যে তিনটি উদ্ধার করা গেছে। “আরও অনেক আলামত সংগ্রহ করেছি। এছাড়া আর কেমিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী দাহ্য পদার্থ ছিল কেরোসিন জাতীয় পদার্থ এবং সেটা কোথা থেকে কেনা হয়েছে সেটাও আমরা পেয়েছি, ” বলেন মো. ইকবাল।