• সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৪ রাত

আড়ংকে জরিমানা, বদলির ১২ ঘন্টা পর আবারও স্বপদে বহাল

  • প্রকাশিত ১২:২০ দুপুর জুন ৪, ২০১৯
জাতীয় ভোক্তা
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। ছবি: ফেসবুক থেকে

‘ওনাকে বদলি করে দেওয়ার অর্থ ১৬ কোটি ভোক্তার আশা ভরসার জায়গা নষ্ট করে দেওয়া। এর মাধ্যমে যেমন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হবে, তেমনই পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে ভীতি ও অনাগ্রহের সৃষ্টি হবে।’

মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে একটি পাঞ্জাবি দ্বিগুণ দামে বিক্রি করে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে আড়ংয়ের উত্তরা আউটলেটকে জরিমানা করা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সেই কর্মকর্তাকে বদলির মাত্র ১২ ঘন্টার ব্যবধানে নাটকীয়ভাবে বদলির আদেশ প্রত্যাহারের খবর পাওয়া গেছে। 

৩ জুন, সোমবার সন্ধ্যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলির আদেশটির প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। এর কয়েকঘন্টা আগে দুপুরে তিনি আড়ংকে সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা ও ২৪ ঘন্টার জন্য উত্তরা আউটলেট বন্ধের আদেশ দিয়েছিলেন।  

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনটি জারি করার পরই মূহুর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। এসময় অনেকেই মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।  

বদলির আদেশ স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরক্তি সচিব (এপিডি) শেখ ইউসুফ হারুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের বদলির আদেশটি স্থগিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।” 

বাজারে অভিযান পরিচালনার সঙ্গে বদলির আদেশের কোনো যোগসূত্র নেই দাবি করে শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, “বাজারে অভিযান পরিচালনার সঙ্গে এই বদলির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তার মেয়াদ দুই বছর হয়ে গেছে। তাকে নিয়মিত বদলির অর্ডারই দেওয়া হয়েছিল। তবে বদলির আদেশ ও অভিযান পরিচালনার ঘটনা একইদিনে হওয়ায় এটি আলোচনায় এসেছে।”

এদিকে ৪ জুন, মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে ডাকসু এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া একটি পোস্টে জানানো হয়,  ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলির আদেশ স্থগিত করে তাকে স্বপদে বহালের আদেশ দিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দোদুল।

গোলাম রাব্বানী স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

“বলেছিলাম, এটা শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, কোন অন্যায় বরদাস্ত করা হবে না! ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জনাব মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার ভাইয়ের বদলীর আদেশ স্থগিত করে তাকে স্বপদে বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব ফরহাদ হোসেন দোদুল ভাই। গতকাল মন্ত্রী মহোদয়কে এ বিষয়ে অবহিত করার পর কিছুক্ষণ পূর্বে তিনি মুঠোফোনে আমাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আশা করবো, শাহরিয়ার ভাই এবং তার মতো কর্তব্যপরায়ণ অফিসারগণ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে জনগণের সেবা করে যাবেন।”

বদলির আদেশ স্থগিতের প্রজ্ঞাপন। 

এ বিষয়ে মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বদলির আদেশ স্থগিতের বিষয়ে আমি এখনো কিছু জানি না। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এ বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এরপর থেকেই সাংবাদিকেরা আমাকে ফোন করতে শুরু করেন।”

এর আগে ৩ জুন, সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-১ অধিশাখা থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর খুলনা জোনের এস্টেট ও আইন কর্মকর্তা হিসেবে মঞ্জুরুল ইসলামকে বদলি করা হয়।  

মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, উপসচিব পদমর্যাদায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের বিভাগীয় কার্যালয় ঢাকার উপপরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে এস্টেট ও আইন কর্মকর্তা হিসেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, খুলনা জোনে ন্যস্ত করা হলো। আগামী ১৩ জুন তাকে বদলি করা কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে। নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে ১৩ জুন বিকেলে তিনি বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন।

মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বদলির বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক শফিকুল ইসলাম লস্কর ও সহকারী পরিচালক মাসুম আরেফিনকে ফোনে পাওয়া যায়নি। 

তবে অধিদফতরের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, “আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। কি কারণে বদলি করা হয়েছে, তা জানা নেই।”

বদলির বিষয়ে মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার নিজেও বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি। ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “সোমবার আড়ংকে জরিমানা করার পর অফিসে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে একটি টেলিভিশনের লাইভ অনুষ্ঠানে গিয়ে জানতে পারি আমার বদলির আদেশ হয়েছে।”

মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, “চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ঈদের আগে হঠাৎ বদলি আমার পরিবারের জন্য ভালো খবর নয়। তবে যেখানেই যাই মানুষের জন্য কাজ করে যাবো।” 

এদিকে মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলির বিষয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন কনসাস কনজুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ। 

পলাশ মাহমুদ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যে সক্রিয়ভাবে অভিযান করছিল তার মূল নায়ক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। ওনাকে বদলি করে দেওয়ার অর্থ ১৬ কোটি ভোক্তার আশা ভরসার জায়গা নষ্ট করে দেওয়া। এর মাধ্যমে যেমন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ওপরও মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। তেমনই পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে ভীতি ও অনাগ্রহের সৃষ্টি হবে।” 

তিনি বলেন, “মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলির মাধ্যমে মুনাফাখোরদের কাছে ১৬ কোটি ভোক্তার পরাজয় হলো। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা এমন সৎ, নির্ভিক, নির্লোভ একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। কনসাস কনজুমার্স সোসাইটির অবিলম্বে তার বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।”

মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২১তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষা জীবন শেষে বিসিএস (প্রশাসন) কর্মকতা হিসেবে যোগদান করেন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি মানিকগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ছিলেন। সুনামগঞ্জ জেলা থেকে তাকে বদলি করার খবরে সাধারণ মানুষও কেঁদেছিলেন, বদলি ঠেকাতে আয়োজন করেছিলেন মানবন্ধনেরও। 

মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের নেতৃত্বে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার বিরুদ্ধে জোরালো কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। গত ৩০ মে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে রাজধানীর ধানমন্ডির পারসোনা ও ফারজানা শাকিলস মেকওভার সেলুনকেও জরিমানা করেন। এ ছাড়া দেশব্যাপী আলোচিত ভেজালের দায়ে নিষিদ্ধ ৫২ পণ্য বাজার থেকে উৎখাত বিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। গত ২৩ মে, বৃহস্পতিবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তার কার্যক্রমের প্রশংসা করেছিলেন হাইকোর্ট।