• সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:১৫ সন্ধ্যা

মৃত্যুর আগে ১৮ জনের নাম জানিয়েছিলেন 'ইয়াবা ডন' সাইফুল

  • প্রকাশিত ১০:২৭ রাত জুন ১০, ২০১৯
হাজি সাইফুল করিম
ইয়াবা ডন হাজি সাইফুল করিম। ছবি : সংগৃহীত

সাইফুল করিমের স্বীকারোক্তির সূত্র ধরে গত ৩০ মে রাতে টেকনাফ থানা পুলিশ অভিযানে গেলে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার ইয়াবা ডন হাজি সাইফুল করিম মৃত্যুর আগে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেন। আটকের পর আলাদা জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ৩৩ জন ইয়াবা কারবারির কথা উল্লেখ করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরমধ্যে ১৮ জনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় জানান সাইফুল।  

সাইফুল করিমের স্বীকারোক্তির সূত্র ধরে গত ৩০ মে রাতে টেকনাফ থানা পুলিশ অভিযানে গেলে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন। থানায় দায়ের করা পুলিশের মামলার এজাহারে সাইফুল করিমের স্বীকারোক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, সাইফুল করিম মৃত্যুর আগে পুলিশের আলাদা জিজ্ঞাসাবাদে টেকনাফ সীমান্তের ইয়াবা ব্যবসায়ী ও হুন্ডি চক্রের ৩৩ জন প্রভাবশালী ইয়াবা ডনের তথ্য ফাঁস করেন। এরমধ্যে টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুর রহমান বদির দুই ভাই মৌলভী মুজিব ও আবদুল শুক্কুর, ফুফাতো ভাই রাসেল, টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তার ছেলে টেকনাফ সদর ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া, টেকনাফের হুন্ডি সম্রাট জাফর আলম ওরফে টিটি জাফর, তার ছোট ভাই গফুর, নাজিরপাড়ার ইয়াবা সম্রাট নুরুল হক ভুট্টু, এনামুল হক মেম্বারসহ অনেকের নাম রয়েছে। 

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সাইফুল করিম স্বীকার করেন, আইনশৃংখলা বাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার পর থেকে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন এবং এরপর থেকে এলাকার ইয়াবা ব্যবসার সিন্ডিকেট নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, মিয়ানমার থেকে আমদানী পণ্যের ভেতরে লুকিয়ে বাংলাদেশে প্রথম ইয়াবা ট্যাবলেট নিয়ে আসেন সাইফুল। তখন থেকে তিনি নিজে টেকনাফসহ সারাদেশে ইয়াবার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার অন্যতম সহযোগী ছিল টেকনাফের হুন্ডি সম্রাট জাফর আলম। জাফরের মাধ্যমে হুন্ডির টাকায় বাংলাদেশে ইয়াবার চালান আনা হতো এবং সিন্ডিকেট সদস্য ও সহযোগীদের মাধ্যমে সেই ইয়াবা সারাদেশে পাচার করা হতো। মামলার এজাহারে টেকনাফের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি, পুলিশের কোনো কর্মকর্তা কিংবা সাংবাদিকের নাম নেই।

অন্যদিকে, টেকনাফের নাজিরপাড়ার নুরুল হক ভুট্টু, এনামুল হক মেম্বার (আত্মসমর্পণ করা), দুদু মিয়া, একরাম (আত্মসমর্পণ করা), নুর মোহাম্মদ মাংগ্রী, আবদুর রহমানসহ আরেকটি সিন্ডিকেটের ইয়াবা ব্যবসা টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ও তার ছেলে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানা যায়। 

সাইফুল করিম পুলিশের কাছে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ১৮ জনের পুর্নাঙ্গ নাম ঠিকানা প্রকাশ করেন। তারা হলেন- টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়ার মৃত মো. হোসনের ছেলে জাফর আহমদ (৩৮), অলিয়াবাদ গ্রামের আবু ছিদ্দিকের ছেলে ছৈয়দ আলম ওরফে সোনা মিয়া (৩৫), পুরানk পল্লানপাড়ার হাফেজ আবু বক্করের ছেলে (বদির ভাগনে) মো. ফারুক (৩০), ডেইলপাড়ার কালা মোহাম্মদ আলীর ছেলে মো. আমিন (৩৭), শীলবুনিয়াপাড়ার মৃত লাল মোহাম্মদের ছেলে নুর হাছন (২৮), দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার মৃত খুইল্যা মিয়ার ছেলে আমির আলী ওরফে বর্মাইয়া আলী (৪৮), টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বড়হাবিরপাড়ার মৃত আমির হামজার ছেলে মো. আলী আহম্মদ (৪৫), শীলবুনিয়াপাড়ার মো. রশিদের ছেলে মো. আয়াছ ওরফে বর্মাইয়া আয়াছ (৩৮), তার ছোটভাই মো. ইয়াছের ওরফে বার্মাইয়া ইয়াছের (২৮), শীলবুনিয়াপাড়ার জুবায়েরের ছেলে মো. দেলোয়ার (৩০), কেরুণতলী এলাকার রশিদ আহমদের ছেলে মো. মিজান (কোস্টগার্ডের মাল বিক্রেতা) (২৮), লেঙ্গুরবিলের জাফর চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশে মো. হোসেনের ছেলে মো. কাদের (২৮), অলিয়াবাদ গ্রামের সিদ্দিক আহমদের ছেলে রবিউল আলম (২৫), শীলবুনিয়াপাড়ার সোলাইমানের ছেলে মো. শফিক (৪৮), শীলবুনিয়াপাড়ার আবুল হোসেনের ছেলে মো. শামসু (২৮), উত্তর লম্বরীর মাহবুব সর্দারের ছেলে মো. শামসু (৩৫), মধ্য জালিয়াপাড়ার মো. হোসেনের ছেলে মো. মনিরুজ্জামান ওরফে আমির সাব ( ৪৮) ও নিহত সাইফুল করিমের ভাগ্নে মো. মিজান (২৭)।

মামলার এজাহারের বলা হয়, সাইফুল টেকনাফ স্থলবন্দরের বৈধ ব্যবসার আড়ালে উপরে উল্লেখিত আসামিদের মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করতেন। মিয়ানমারের মংডু শহর থেকে ইয়াবা টেকনাফ এনে সারাদেশে পাচার করতেন। মামলার আসামিরা যৌথ মুলধন বিনিয়োগ করে ইয়াবা পাচারের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি কিনে দখল নিয়ন্ত্রণ করতেন। 

কক্সবাজারের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ৭৩ ইয়াবা গডফাদারের তালিকায় নিহত সাইফুল করিম ছিল দুই নম্বরে। এক নম্বরে ছিল সাবেক এমপি বদির নাম। তালিকায় আছে চার ভাইসহ বদির পরিবারের ২৬ জনের নাম। এরমধ্যে কয়েকজন আত্মসমর্পণ করলেও অনেকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাদের বাইরে রেখে ইয়াবা চোরাচালান বন্ধ করা কঠিন।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাস বলেন, সাইফুল করিম মৃত্যুর আগে পুলিশের আলাদা জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকটি সিন্ডিকেটের ৩৩ জন ইয়াবা ও হুন্ডিচক্রের ব্যাপারে পুলিশকে গুরুত্বপুর্ণ তথ্য দিয়েছে। সাইফুল করিম হত্যা মামলার এজাহারে ৩৩ জনের ব্যাপারে উল্লেখ রয়েছে। আসামিদের ধরার চেষ্টা চলছে।

গত ৩০ মে গভীর রাতে টেকনাফ স্থল বন্দরের সীমানা প্রাচীরের শেষ প্রান্তে নাফনদীর পাড়ে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সাইফুল করিম নিহত হন। ৩১ মে টেকনাফ মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাসেল আহমদ বাদি হয়ে ৩৩ জনের বিরুদ্ধে আলাদা তিনটি মামলা করেন।