• রবিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৭ রাত

বঙ্গবন্ধু জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন তানিয়া খান

  • প্রকাশিত ০৮:১৯ রাত জুন ১৬, ২০১৯
তানিয়া খান
স্বামী মুনীর আহমেদের সঙ্গে তানিয়া খান। ছবি: নুসরাত নিটোল

এই সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে আহত ও অসুস্থ বন্যপ্রাণীদের পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ করে তাদের নিজ আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হতো। এখন পর্যন্ত ৩০-৩৫ প্রজাতির ৫ হাজারের অধিক পাখি এবং ৮-৯ প্রজাতির ৪ শতাধিক বন্যপ্রাণীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন নিজের স্বেচ্ছাশ্রমে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখায় চলতি বছর বঙ্গবন্ধু জাতীয় পুরস্কার (মরণোত্তর) পাচ্ছেন বন্যপ্রাণী গবেষক ও ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বন্যপ্রাণী সেবা কেন্দ্র ‘সেভ আওয়ার আনপ্রোটেক্টেড লাইফ (সোল) -এর পরিচালক সদ্যপ্রয়াত তানিয়া খান। 

আগামী ২০ জুন, বৃহস্পতিবার ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা ২০১৯’ এবং ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০১৯’ অনুষ্ঠান উদ্বোধনকালে তানিয়া খানের পরিবারের সদস্যদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

বন বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন-২০১৯’-এর ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, খ্যাতিমান গবেষক, বিজ্ঞানী, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদী ব্যক্তি ও গণমাধ্যমকর্মী বা ব্যক্তিত্ব’  ক্যাটাগরিতে তানিয়া খান এ পুরস্কার পাচ্ছেন। 

তানিয়া খান ছাড়াও চলতি বছর আরো দুইজনকে এ পুরস্কার দেওয়া হবে। পুরস্কারটির নীতিমালা অনুযায়ী পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দুই ভরি (২৩.৩২ গ্রাম) ওজনের স্বর্ণের বাজারমূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ, ৫০ হাজার টাকার চেক ও সনদপত্র দেওয়া হবে। বিরল, বিপদাপন্ন, বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী প্রজাতি সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১০ সালে প্রথম এ জাতীয় পুরস্কার চালু করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

নিজের ভাড়া বাড়িটিকে বন্যপ্রাণী সেবা কেন্দ্র ‘সেভ আওয়ার আনপ্রোটেক্টেড লাইফ (সোল)’ এর কার্যালয় হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন তানিয়া খান। ছবি: সংগৃহীত

তানিয়া খানের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। ২০০৬ সাল থেকেই বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতে শুরু করেন তিনি। ২০০৯ সালে বন বিভাগের শ্রীমঙ্গল অঞ্চলের রেঞ্জার মুনীর আহমেদ খানের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। ছোটবেলা থেকে তার মধ্যে যে প্রাণিপ্রেম ছিল, বন কর্মকর্তার সঙ্গে বিয়ে তা নতুন মাত্রা এনে দেয়। বিয়ের পর কখনো মুনীর আহমেদ খানের সঙ্গে, কখনো একা, কখনো অন্যদের সঙ্গে দলবেঁধে বন থেকে বনে ছুটে বেড়িয়েছেন বন্য প্রাণিপ্রেমী তানিয়া খান।

বন্য প্রাণী রক্ষা ও তার সেবায় বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন ফর ন্যাচার), নিসর্গসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে করেছেন তানিয়া খান।

২০১৪ সালে হবিগঞ্জের সাতছড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে তানিয়া খান খুঁজে পান থ্রি স্টামস বাংকিং নামের একটি পাখি। এই পাখি দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় এবং দেশে প্রথম দেখার রেকর্ড হয়। ২০১৩ সালে সাতছড়িতে হিল ব্লু ফ্লাই ক্যাচার খুঁজে পান তিনি।

তানিয়া খান লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ‘পাইড ওয়ার্টি ফ্রগ’ নামের একটি ক্ষুদ্র ব্যাঙ আবিষ্কার করেন ২০১২ সালে। এ ছাড়া ‘বুশ ফ্রগ’ জাতের আরও একটি ব্যাঙের দেখাও পেয়েছেন, যার নাম এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

২০১২ সালে প্রথম এবং ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে মৃত ‘চিকিলা ফুলেরি’ নামের একটি প্রাণী আবিষ্কার করেন তানিয়া খান। এটি একটি অতি বিরল প্রাণী। মৌলভীবাজারের আদমপুরে ‘ফলস কোবরা’ নামের একটি সাপ এবং লাউয়াছড়ায় ‘হিমালয়ান মোল’ নামের এক প্রাণী আবিষ্কার করেন। এ দুটি প্রাণীও দেশে প্রথম দেখার রেকর্ড তানিয়ারই। 

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রাণী গবেষকদের একটি দল। বাঁ থেকে দ্বিতীয় ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার মুনীর আহমেদ ও তার স্ত্রী তানিয়া খান (তৃতীয়), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল খান ও কামরুল হাসান। ছবি: মনিরুল খানের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

২০১৬ সালে ব্যক্তি উদ্যোগে মৌলভীবাজারের নিজ বাসায় ‘সোল (সেভ আওয়ার আনপ্রোটেক্টেড লাইফ) ’ নামে একটি বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, যার পরিচালক ছিলেন তিনি নিজেই। এই সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে আহত ও অসুস্থ বন্যপ্রাণীদের পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ করে তাদের নিজ আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হতো। এখন পর্যন্ত ৩০-৩৫ প্রজাতির ৫ হাজারের অধিক পাখি এবং ৮-৯ প্রজাতির ৪ শতাধিক বন্যপ্রাণীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন নিজের স্বেচ্ছাশ্রমে।

তানিয়া খানের লেখা ১৫টি গবেষণা নিবন্ধ দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।এ ছাড়া যৌথভাবে প্রজাপতি, বামন মাছরাঙা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার চারটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তানিয়া খান তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ Big birder Award-2015, Bangladesh Biodiversity Conservation Fedaration Award -2017, Tree Fair Award-2017 পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

চলতি বছর ১৩ মার্চ, বুধবার সকালে সিলেটের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়া বাড়িতে তানিয়া খানকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ব্যক্তি জীবনে তানিয়া খান প্রয়াত ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার মুনির আহমেদের স্ত্রী। মুনীর আহমেদ ২০১৫ সালে একটি দুর্ঘটনায় মারা যান। তারপরও বন্য প্রাণী গবেষণার কাজে মৌলভীবাজারেই থেকে যান তানিয়া খান। বিবাহিত জীবনে তিনি তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী।