• রবিবার, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০৩ রাত

রোহিঙ্গারা চায় স্থায়ী সমাধান

  • প্রকাশিত ০৯:৪৭ রাত জুন ১৯, ২০১৯
রোহিঙ্গা ক্যাম্প
রোহিঙ্গা ক্যাম্প মাহমুদ হোসাইন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

১৯৭৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে থামেনি এখনও। তবে কক্সবাজারে শরণার্থী হিসেবে থাকা রোহিঙ্গারা চান ফিরে যেতে। স্থানীয় জনগণও চান দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে।

প্রতিবছরের মতো এবারও ২০ জুন তারিখটিকে পালন করা হবে বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবে। তবে কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এ দিবস সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা নেই। এ সম্পর্কে জানার প্রয়োজনও মনে করেন না তারা। তাদের চাওয়া সব সমস্যার সমাধান করে দ্রুত নিজ দেশে ফেরা। স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে সম্মানজনকভাবে দেশে ফিরে গিয়ে নিজ মাতৃভূতিতে নিঃশ্বাস ফেলতে চান তারা।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস সম্পর্কে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থী নেতার সঙ্গে কথা হয় ঢাকা ট্রিবিউনের। তারা জানিয়েছেন, “আমাদের ইচ্ছা এই মুহূর্তে রাখাইনে ফেরত যাওয়া। আমাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। আমরা চাই বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় আন্তর্জাতিক মহল এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থা মিয়ানমারকে চাপ সৃষ্টি করে আমাদের ফেরত যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিক।”

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। তবে এদেশে তাদের অনুপ্রবেশের ইতিহাস আরও পুরনো। মূলতঃ ১৯৭৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে থামেনি এখনও।

ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শরণার্থী। মাহমুদ হোসাইন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর ও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। বর্তমানে নতুন-পুরনো মিলিয়ে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। উখিয়া ও টেকনাফে ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসব রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ সরকার। 

এই পরিস্থিতির মধ্যেই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার (২০ জুন) পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৬ কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন। তবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক। 

মূলতঃ যুদ্ধ, জাতিগত সন্ত্রাসই সাম্প্রতিক সময়ে শরণার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ। 

এদিকে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের দাবি প্রতিবছর শুধু শরণার্থী দিবস পালন নয়, তারা ফিরতে চান নিজ দেশে। তারা আর বাংলাদেশের বোঝা হয়ে থাকতে চান না। 

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মুহিব উল্লাহ বলেন, ‘‘যতই সাহায্য-সহযোগিতা পাই না কেন, ভিনদেশে কি কারও ভাল লাগে? এই রোহিঙ্গা বস্তিতে কোনোরকমে থাকলেও মনটা রাখাইনে পড়ে আছে। দেশে ফেরার আশায় বুক বেঁধে আছি। জানিনা আল্লাহ আমাদের ওপর কতটুক সহায় হন। আমরা এখনও স্বপ্ন দেখি রাখাইনে ফিরে যেতে।’’

ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শরণার্থী। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

শুধু রোহিঙ্গা নয়, কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লালু মাঝি, ফয়েজ মাঝি, উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নুর মোহাম্মদ সুফিয়া বেগম টেকনাফ লেদা ক্যাম্পের দুদুমিয়া ও নয়াপাড়া ক্যাম্পের শফিউল্লাহ সহ সচেতন অনেক রোহিঙ্গাদের একই দাবি।

কক্সবাজারের স্থানীয়রাও মনেপ্রাণে চান রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন। 

এ বিষয়ে কক্সবাজারের কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গারা এখন আমাদের এলাকার জন্য সমস্যার নামান্তর। আদৌ এ সমস্যার সমাধান হবে কি না সে বিষয়ে আমরা সন্দিহান। স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে তিনি দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দাবি জানান।

কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যবাসন কমিটি সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াতেই আটকে আছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন। দীর্ঘসময় ধরে বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরার বিষয়টি ঝুলে আছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির একাধিক বৈঠকের পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আলোর মুখ দেখেনি। কারণ তাদেরকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। অন্যথায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কোনোদিনই হবে না।

বিভিন্ন সময় রাখাইন থেকে বাংলাদেশে এসেছে রোহিঙ্গারা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

এ বিষয়ে আর্ন্তজাতিক অভিবাসন সংস্থার ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অফিসার তারেক মাহমুদ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের সব সংস্থা কেন্দ্রীয় ও ক্যাম্প পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করবে। তবে যতদিন পর্যন্ত তারা বাংলাদেশে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে এবং তাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাবে।’’

একদিকে সেই ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন প্রচেষ্টার পরেও বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানোর সম্ভাবনা গিয়ে ঠেকেছে শুন্যের কোটায়। অন্যদিকে, সে দেশে জনসংখ্যা জরিপে রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে অর্ন্তভূক্তির বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গারা।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কিছু এনজিও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে। কারণ তারা চায় না রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাক। 

এদিকে, ক্যাম্পে নিরাপত্তার অভাব থাকায় রোহিঙ্গারা প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়াছে। যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকার উচ্চপর্যায়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। আমাদের যে ঐতিহাসিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক সম্পর্ক সেসব বিষয়গুলো নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে।