• রবিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫৩ সকাল

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং: প্রয়োজন নাকি ঝোঁক?

  • প্রকাশিত ০৮:৪১ রাত জুলাই ১৭, ২০১৯
কোচিং
রাজধানীর কোচিং সেন্টার রাজীব ধর/ঢাকা ট্রিবিউন

‘চাহিদা আছে বলেই কোচিং বাণিজ্যের বাজার তৈরি হয়েছে এবং টিকে আছে। তাই প্রথমে অভিভাবকদের প্রতিযোগিতার মনোভাব থেকে সরে আসতে হবে’

কোচিং বাণিজ্য বন্ধের জন্য সরকারের নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি এক রায় দেয় হাইকোর্ট। এই রায়ের ফলে সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কোচিং করাতে পারবেন না।

এ রায়ে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং করানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারির অভাবে আড়ালে থেকে গেছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ের নামে খণ্ডকালীন কিন্তু বিশাল এক ব্যবসায়ী চক্রের কথা।

তবে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এবং ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকেও সচেতন একটি অংশ মনে করেন, ভর্তি কোচিং না করেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায়।

এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন“বর্তমান সময়ে এসে শহর ছাড়িয়ে গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত কোচিং পৌঁছে  গেছে। তাই শুধুমাত্র চাইলেই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিকোচিং বন্ধ করা যাবে না। কারণ,   ভর্তি পরীক্ষার সময় যে তীব্র প্রতিযোগিতা হয় সে কারণে আগে থেকেই কোচিংয়ে অভ্যস্ত শিক্ষার্থীরা মনস্তাত্ত্বিক কারণ থেকেই কোচিংয়ে ভর্তি হয়।”

সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম আরও বলেন, “কোচিং সেন্টারগুলো সম্পূর্ণ অবৈধভাবে শিক্ষার্থীদের ছবি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে।পুরো বছর ধরেই মেডিকেল,  ইঞ্জিনিয়ারিংসহ সবধরনের ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং সেন্টার এমন প্রচারণা চালিয়ে থাকে।”

এই শিক্ষাবিদ মনে করেন, কোচিং বন্ধ করতে হলে একেবারে গোড়া থেকেই বন্ধ করতে হবে এবং সেজন্য শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের পাশাপাশি সরকারকেও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।

অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের মতে, “চাহিদা আছে বলেই কোচিং বাণিজ্যের বাজার তৈরি হয়েছে এবং টিকে আছে। তাই প্রথমে অভিভাবকদের প্রতিযোগিতার মনোভাব থেকে সরে আসতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও আনতে হবে পরিবর্তন। পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাদ দিয়ে আনতে হবে শ্রেণিকক্ষের মূল্যায়ন ব্যবস্থা। শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করতে হবে। প্রাথমিক থেকেই আনতে হবে আমূল পরিবর্তন।”

রাজধানীর নটরডেম কলেজের সাবেক শিক্ষক এ এন রাশেদা বলেন, কোচিং এখন একধরনের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। কোচিংয়ের উদ্দেশ্য হতে পারে শিক্ষাদান। কিন্তু ব্যবসা হওয়াটা সমীচীন না। 

শিক্ষার্থীদের কোচিং প্রবণতার জন্য অভিভাবকদের দায়ী করে তিনি বলেন, অভিভাবকরা অতি উৎসাহী হয়ে সন্তানদেরকে কোচিংয়ে ভর্তি করে দেন। এই সিস্টেমের সরাসরি বিরুদ্ধে যাচ্ছি না। কিন্তু এর একটা লাগাম থাকা প্রয়োজন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মানস চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, চিন্তাক্লিষ্ট বাবা-মা যখন তাদের বাচ্চাদের কোচিংয়ে দেন, সেটার একটা বৃহত্তর প্রেক্ষাপট আছে। আর পাঁচজন যাচ্ছেন বলেই সবার মধ্যে একটা অনিরাপত্তার বোধ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গটা পরিস্থিতির একটা দুর্দশার উপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদের দুশ্চিন্তাটাকে দেখতে হবে পরিস্থিতির বিবেচনায়। কিন্তু অবশ্যই পড়ালেখার কাঠামোটা শক্তিশালী হলে আরও অনায়াসে বলা যেতো যে এগুলোর কোনো দরকার নেই। এমনকি কোচিংয়ের চক্রটাই তখন দাঁড়িয়ে যেতে পারত না। কোচিং একপ্রকার বাণিজ্য। শিক্ষা ক্ষেত্রে কোনও বাণিজ্যের পক্ষেই আমি নই।

চলতি শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য কোচিং করা প্রয়োজন। কারণ এটা একধরনের গাইডলাইন।

তবে বিপরীত কথাও বলেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে,  পাঠ্যবই সম্পর্কে ভাল ধারণা এবং ভর্তি পরীক্ষার পূর্ববর্তী বছরগুলোর প্রশ্নের ধরণ অনুসরণ করে পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায়।

এপ্রসঙ্গে ভর্তি কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, তারাও বেশ প্রস্তুতি নিয়েই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত মেডিকেল ভর্তি কোচিং ‘উন্মেষ’-এর ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা আলিফ মুন্সী ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, গত মে মাস থেকেই তারা কোচিং কার্যক্রম শুরু করেছেন। এবছর তাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন বারো-তেরশ' শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এসেছেন রাজধানীর বাইরে থেকে।

তিনি বলেন“মেডিকেল এবং ভার্সিটি ম্যাথ ভর্তি পরীক্ষার কথা মাথায় রেখেই আমরা গাইডলাইন প্রস্তুত করেছি।”

এবিষয়ে জানতে মুঠোফোনে চাইলে ইউসিসি কোচিং সেন্টারের ম্যানেজার পরিচয় দেওয়া আল মামুন বলেন, “এতদিন পরে কোত্থেকে এসেছেন? আদালতের রায়ে অপেশাদার শিক্ষকদের দিয়ে কোচিং করানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা নেই।”

এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  কোচিংয়ের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবছরই রাজধানীতে আসেন প্রায় লাখখানেক শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীদেরকে পুঁজি করে কোচিং ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সক্রিয় হতে দেখা যায় আরও কয়েক শ্রেণীর ব্যবসায়ীকে। মূলতঃ ফার্মগেট এবং আশপাশের এলাকাগুলোতে প্রায় সবগুলো কোচিং সেন্টারের মূল শাখা হওয়ায় এখানে চলে হোস্টেল বাণিজ্য। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই শিক্ষার্থীরা সেখানে পান গণরুমের স্বাদ। ফ্ল্যাট বাসা থেকে ভাড়াটিয়াদের নামিয়ে সেগুলোকে রূপ দেওয়া হয় হোস্টেলে। তথাকথিত এসব হোস্টেলের থাকার ব্যবস্থা যেমন খারাপ তেমনি খাবারের মানও জঘন্য। কয়েকমাসের জন্য রাজধানীর বাইরে থেকে আসা এসব শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই জিম্মি হতে হয় এসব মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছে।

কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে করা পাঁচটি রিটের ওপর বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও রাজিক আল জলিলের দ্বৈত বেঞ্চ একটি রায় দিয়েছিলেন।

রায়ের পর ওই বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেসুর রহমান জানান, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের নীতিমালা বৈধ ঘোষিত হওয়ায় ক্লাসে পাঠদানের বাইরে মাসে ১৭৩ টাকা করে যে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার বিধান করা হয়েছে তার বাইরে কোনো কোচিং করানো যাবে না।