• শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:৫৪ দুপুর

বই পোকাদের তীর্থস্থান ‘সুধীজন’ পাঠাগার

  • প্রকাশিত ০৩:৩৬ বিকেল জুলাই ১৯, ২০১৯
নারায়ণগঞ্জ
পাঠাগারের ভেতর পরিবেশ মনোরম করতে সবুজায়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

বর্তমানে সুধীজন পাঠাগারে গল্প, কবিতা, সাহিত্য, ভ্রমণ কাহিনী, জীবনী, ধর্মীয়, সাইন্স ফিকশন, কিশোর থ্রিলার, খেলাধুলা, চলচ্চিত্র, সাধারণ জ্ঞানসহ বই রয়েছে  ৩৯ হাজার ৮০৭টি। এর মধ্যে মোট বাংলা বই রয়েছে ৩৫ হাজার ২৬৬ টি এবং ইংরেজি বই রয়েছে ৪ হাজার ৫৪১টি।

মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা, আর লিখিত ভাষার ভাণ্ডার বই। আর এই বইয়ের ভাণ্ডারকে বলা হয় পাঠাগার। এ পাঠাগার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাশব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ইহারা সহসা যদি বিদ্রোহী হইয়া উঠে, নিস্তব্ধতা ভাঙিয়া ফেলে, অক্ষরের বেড়া দগ্ধ করিয়া একেবারে বাহির হইয়া আসে! হিমালয়ের মাথার উপরে কঠিন বরফের মধ্যে যেমন কত কত বন্যা বাঁধা আছে, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে মানবহৃদয়ের বন্যা কে বাঁধিয়া রাখিয়াছে!”

সত্যিই পাঠাগার এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ পৃথিবীর বিচিত্র সব জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পায়। নিত্যনতুন উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতায় নিজেকে বিকশিত করা যায় পাঠাগারের মাধ্যমেই। 

জ্ঞানভাণ্ডার আর অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হচ্ছে সাহিত্য। আর সাহিত্যের ভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচিত করতেই শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের একঝাঁক বই পোকা একটি পাঠাগার গঠনের উদ্যোগ নেন। এই বইপোকার দলে রয়েছেন সুশিক্ষিত চাকুরীজীবি,ব্যবসায়ী এবং স্বপ্নবাজ কিছু তরুণ। প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক নুরুল হক, প্রতিষ্ঠাতা কর্মাধ্যক্ষ ফজলে রাব্বী ও একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সদস্যের সহযোগে শুরু হয়েছিলো ‘সুধীজন পাঠাগার’ এর অগ্রযাত্রা। তাদের গড়া সেই পাঠাগার কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে এখন পরিপূর্ণ। 

তবে সুধীজন পাঠাগারের ৫৫ বছরের যাত্রা মসৃণ ছিলো না, এমনটাই জানা গেল সুধীজন পাঠাগারের ইতিহাস পরিক্রমা থেকে। ১৯৬৪ সালে স্বল্প পুঁজি আর একমুঠো স্বপ্ন নিয়ে শহরের আমলাপাড়া এলাকার ১৬ হরকান্ত ব্যনার্জী রোডের রহমত উল্লাহ হাজীর মালিকানাধীন রজনী নিবাসের একটি  ছোট্ট ঘরে শুরু হয় পাঠাগারের পথচলা। তখন পাঠাগারের সম্বল বলতে ছিলো কেবল ১০টি বই, একটি আলমারি, ১টি টেবিল, ১০টি চেয়ার এবং ২টি হারিকেন। কিন্তু উদ্যোক্ততাদের আন্তরিকতা আর স্বপ্ন পূরণের অভিযাত্রায় বছর শেষে পাঠাগারের বইয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭২৬টি।

পাঠাগার প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের ভেতর হোসেন জামাল,শওকত আলী, সালাহ্উদ্দীন আহমেদ,শরীফ সারোয়ার,আমজাদ হোসেন, আহমেদ শামসুদ্দীন,মফিজুল ইসলাম সারুসহ বেশ কয়েকজন উৎসাহী কর্মী পাঠাগারে যোগ দেওয়ায় পাঠাগাগারের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সহজ হয়ে যায়। 

পাঠাগারের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৯ হাজার ১৬০ জন। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

১৯৬৯ সালে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের   কো-অপারেটিভ ভবনে একবার স্থানান্তরিত করা হয় পাঠাগারটিকে। কিন্তু সেখানে পাঠাগারটির কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হচ্ছিলো না। তবে পাঠাগারের সদস্যরা ছিলেন অগ্রসর চিন্তার মানুষ। তারা পাঠাগারের অতি সামান্য বার্ষিক আয় থেকেও এক দশকের ভেতর পাঠাগার ভবনের নির্মাণ তহবিলে লক্ষ টাকা জমা করে ফেলেন। তারপর নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রয়াত আলী আহম্মদ চুনকা, বিশেষ করে তখনকার মহকুমা প্রশাসক এ.এফ.এম ইমাম হোসেন,তখনকার ঢাকা জেলা প্রশাসক এ.এম.এম শওকত আলী সহযোগিতায় ১৯৭৮ সালে পৌরসভার লিজে প্রদত্ত জমিতে নিজস্ব একতলা ভবনে স্থানান্তরিত হয় সুধীজন পাঠাগার। 

কিন্তু স্থায়ী জায়গা আর ভবন নির্মাণ করার পরও আর্থিক সমস্যা যেন পিছুই ছাড়ছিল না। ঠিক তখনই একটি ঘটনা মোড় ঘুরিয়ে দেয় পাঠাগারের। তখন সবেমাত্র বাংলাদেশ কৃষিব্যাংকের পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন ড. এম.এম শওকত আলী। তারই সমর্থনে পাঠাগার একতলা ও দোতলার তিন বৎসরের ভাড়া সুদমুক্ত অগ্রিম প্রদানে সম্মত হয় কৃষি ব্যাংক। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ সালে নিচতলা এবং ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি দোতলা কৃষি ব্যাংকের কাছে ভাড়ার শর্তে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ১৯৮৭ সালের ২৬ এপ্রিল ভবনের তিনতলায় পাঠাগারের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সুধীজন পাঠাগারকে।  

পাঠাগারে চারপাশজুড়ে শুধু বইয়ের সম্ভার। পাঠাগারটি সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পাঠাগারের প্রবেশ দ্বার থেকে শুরু করে পাঠাগার অধিকাংশ জায়গাজুড়ে বইয়ের সমাহার। পাঠাগার কর্মকর্তা ও সহকারীদের কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে সুধীজন পাঠাগারে গল্প, কবিতা, সাহিত্য, ভ্রমণ কাহিনী, জীবনী , ধর্মীয়, সাইন্স ফিকশন, কিশোর থ্রিলার, খেলাধুলা, চলচ্চিত্র, সাধারণ জ্ঞানসহ বই রয়েছে  ৩৯ হাজার ৮০৭টি। এর মধ্যে মোট বাংলা বই রয়েছে ৩৫ হাজার ২৬৬ টি এবং ইংরেজি বই রয়েছে ৪ হাজার ৫৪১টি। 

পাঠাগার সহকারী হাসান ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, এমন খুব কম বই আছে যা এই পাঠাগারে পাওয়া যায় না। যদি কোনো বই পাঠাগারে না থাকে তাহলে সে বই যত টাকাই হোক সংগ্রহ করা হয়।এ ছাড়া পাঠাগারে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে ‘হোসেন জামাল স্মৃতি পাঠকক্ষ’। 

সুধীজন পাঠাগার শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। রয়েছে মোবাইল লাইব্রেরি সার্ভিসও। নিজস্ব পিকআপ ভ্যান যোগে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্কুলগুলোতে সুধীজন পাঠাগার গ্রন্থ সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। এ ছাড়া সুধীজন পাঠাগারের মাধ্যমে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সাধারণ জ্ঞান, বিতর্ক, বাংলা বানান ও নানা রকম সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। 

বাংলা-ইংলিশ মিলিয়ে পাঠাগারের বইয়ের সংগ্রহ ৩৯ হাজার ৮০৭টি। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

এ ছাড়া প্রতিবছর মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় উৎসাহিত করতে এবং পাঠাগার প্রতিষ্ঠাসহ শিক্ষা-সাহিত্য ও সমাজ সেবায় অবদান রাখার জন্য মোট ৮টি বৃত্তি চালু রয়েছে। বৃত্তিগুলোর মধ্যে ৬টি প্রয়াত বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে এবং ২টি বৃত্তি চালু রয়েছে পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক নুরুল হক ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের নামে। বৃত্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হোসেন জামাল স্মৃতি বৃত্তি, অধ্যাপক নুরুল হক বৃত্তি, হেদুন বেপারী স্মৃতি বৃত্তি, হাজী   মো. ইলিয়াছ স্মৃতি বৃত্তি, হাজী রহমতউল্লাহ ও সাহারা খাতুন স্মৃতি বৃত্তি, আলী আহাম্মদ চুনকা স্মৃতি বৃত্তি, এ এ আব্দুল আলী ও সৈয়দা সুলতানা বানু স্মৃতি বৃত্তি এবং আনোয়ারা বেগম বৃত্তি।

প্রতিবছর সুধীজন পাঠাগার থেকে দেশের একজন গুণী ব্যক্তিকে শিক্ষা বিষয়ক যে কোনো শাখায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য ‘হোসেন জামাল স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রন্থনীতি প্রণয়ন, পুস্তক রপ্তানি, প্রকাশনা, গ্রন্থাগার সংগঠন ইত্যাদি বিষয়েও জাতীয় পর্যায়ে পাঠাগারটি অবদান রাখার চেষ্টা করে চলেছে। মানুষকে বইপড়ার ও জ্ঞান চর্চায় এর বাইরেও  বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান পাঠাগারের পাঠাগারের কর্মাধ্যক্ষ আলামীন।

তিনি জানান, সুধীজন পাঠাগারের রয়েছে নিজস্ব কিছু প্রকাশনা। এ পর্যন্ত পাঠাগারের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে তিনটি বই। যেগুলোতে উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য। ১৯৮৫ সালে ২৬ মার্চ প্রকাশিত হয় নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস, ১৯৯৪ সালে ড. করুণাময় গোস্বামীর সম্পাদনায় ও এ.কে.এম শামসুজ্জোহা ফাউন্ডেশনের অর্থ সাহায্যে প্রকাশিত হয় ‘বাংলা সংস্কৃতির শতবর্ষ, ২০০৫ সালে ৩১ জুলাই ‘অধ্যক্ষ খগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী’ স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এরপর ২০১৭ সালে ১ জুন নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস বইটি পুনঃমুদ্রিত হয়। এসব বইয়ে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মাত্র ২৫ জনকে নিয়ে পাঠাগারটি যাত্রা শুরু হলেও এর সদস্য সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ৫৫ বছরে এর সদস্য সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ১৬০ জনে। এর মধ্যে ছাত্র সদস্য ৬ হাজার ৯০১ জন এবং সাধারণ সদস্য ২ হাজার ২৫৯ জন। বর্তমানে পাঠাগারের দেখাশুনা ও লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্বে আছেন ৭ জন কর্মচারী। 

পাঠাগারটির সদস্য হতে শিক্ষার্থীদের বাৎসরিক ১২০ টাকা এবং সাধারণকে ১৮০ টাকা চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন সদস্যদের বাইরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠক পাঠাগারে বসে পত্রিকা এবং বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন পড়ার সুযোগ পান।

বর্তমানে সুধীজনের অগ্রগতি নিয়ে কথা হয় সুধীজন পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সদস্য মোহাম্মদ ইসহাকের সাথে। তিনি জানান, ৫৫ বছর আগে যারা পাঠাগারকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিল তাদের পরিকল্পনা ছিল দুরদৃষ্টি সম্পন্ন। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে পাঠাগারটিকে আধুনিকায়ন করার। কিছু কার্যক্রম শুরুও করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, “বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমার একটাই কথা যত বেশি বই পড়বে তত বেশি নিজের জ্ঞান সমৃদ্ধ ও সম্প্রসারিত হবে।”