• শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৭ রাত

ছেলেধরা গুজবে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না নওগাঁর শিশুরা

  • প্রকাশিত ০৫:০৬ সন্ধ্যা জুলাই ২২, ২০১৯
নওগাঁ

শ্রমজীবী বাবা-মায়েরা বেশি আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। শিশুরাও বিদ্যালয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে

পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা ব্যবহারের গুজব দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এদিকে, ছেলেধরা গুজবে উপস্থিতি কমেছে নওগাঁর প্রাথমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা।

জানা গেছে, ‘পদ্মা সেতুতে শিশুদের মাথা লাগছে’, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন গুজব ছড়ানোর পর শিশুদের সাবধানে রাখার জন্য পরামর্শমূলক বার্তাও মেসেঞ্জারে পাঠানো হয়। ফলে গুজবটি দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই গুজব এখন ভয়াবহ আতংকে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী বাবা-মায়েরা বেশি আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। শিশুরাও বিদ্যালয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে। অনেক বাবা-মা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে।

প্রসঙ্গত, রবিবার (২১ জুলাই) নওগাঁর মান্দায় ছেলেধরা সন্দেহে ৬ জেলেকে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী। খবর পেয়ে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। তারা নওগাঁ সদর উপজেলার খাগড়া গ্রাম থেকে ওই এলাকায় মাছ শিকার করতে গিয়েছিলেন। একইদিনে মানসিক ভারস্যামহীন আবুল কালাম (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে ছেলে ধরা সন্দেহে উপজেলার মহানগর গ্রামে গণপিটুনি দিয়ে থানায় সোপর্দ করে এলাকাবাসী।

গণপিটুনিতে আহত জেলে সাদ্দাম হোসেন জানান, “বুড়িদহ এলাকায় সঞ্জিতের পুকুরে ছোট মাছ ধরতে গিয়ে গোপনে তিনটি বড় মাছ বস্তার মধ্যে লুকিয়ে রাখি। বিষয়টি পুকুর মালিক বুঝতে পারলে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়। মারধরের ভয়ে দৌড় দিলে তারা ছেলেধরা বলে চিৎকার শুরু করে। তখন এলাকাবাসী ধরে আমাদের মারপিট করে। পরে পুলিশ এসে আমাদের উদ্ধার করে। পুলিশ না এলে আমরা মারা যেতাম।”

বদলগাছী উপজেলার চাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৪ জন। কিন্তু গত এক সপ্তাহে ছেলে ধরা গুজবে উপস্থিতি ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

নওগাঁ সদর উপজেলার কীত্তিপুর-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১০ জন হলেও উপস্থিত ছিল ৮০ জন।

সাপাহার উপজেলার আইহাই ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় মুংরইল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০ জন। গত কয়েক দিনে ছেলে ধরা গুজবে এ বিদ্যালয়ে এখন উপস্থিতির সংখ্যা গড়ে ৫০ জন বলে জানা গেছে।

বদলগাছী উপজেলার চাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র শামীম জানায়, পাড়ার লোকজন বাড়িতে গিয়ে গিয়ে গলাকাটার ভয় দেখিয়েছে। এজন্য বাবা-মা গত তিন দিন স্কুলে আসতে দেয়নি। 

চাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তার বলেন, টেলিভিশন ও পত্রিকায় খবর দেখাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় ছেলেধরা গুজব। এতে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে ভয় পাচ্ছিল। আমরা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বুঝিয়েছি ছেলেধরা একটা গুজব ও আতংক। যা মিথ্যা ও অপপ্রচার। এরপর শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে শুরু করেছে।

সাপাহার উপজেলার মুংরইল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, আমাদের গ্রামটি সীমান্তবর্তী। গত কয়েকদিন থেকে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে ছেলেধরা গুজব আতংক। এতে করে শিশুরা বিদ্যালয়ে আসতে ভয় পাচ্ছে। ফলে কমেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতি।

নওগাঁ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আমিনুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে শিক্ষা অফিসারদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ছেলেধরা নিয়ে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। গত কয়েক দিন থেকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। এখন তার নিয়মিত আসতে শুরু করেছে। 

এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, এটা একটা গুজব। এ ধরনের গুজবে কাউকে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মসজিদের মাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচারে রোধে মুসল্লিদের কান না দেওয়ার জন্য প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।