• বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৯ রাত

মায়ের হাতে খাওয়ার অপেক্ষায় তুবা

  • প্রকাশিত ০১:৫৫ দুপুর জুলাই ২৩, ২০১৯
তুবা
মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে তুবা ঢাকা ট্রিবিউন

কিন্তু এই অপেক্ষার প্রহর যে ফুরানোর নয়! মনে পড়লেই মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে অবুঝ শিশুটি

রাজধানীর বাড্ডায় গনপিটুনিতে নিহত তাসলিমা আক্তার রেনুর চার বছর বয়সী মেয়ে তুবা অপেক্ষা করছে। মা তার জন্য নতুন ড্রেস নিয়ে একটার সময় বাসায় ফিরে এসে মুখে তুলে খাইয়ে দেবেন। কিন্তু চারটি দিন পেরিয়ে গেলেও মা বাসায় ফেরেননি। অথচ তুবা জানে মা দুপুর একটায় বাসায় ফিরবেন।

রায়পুর উপজেলার সোনাপুর গ্রামে নিহত তাসলিমার বাবার বাড়িতে গিয়ে দেখা মেলে মায়ের জন্য অপেক্ষারত তাসনিম তুবার। তার কাছে পাওয়া-না পাওয়ার পার্থক্য নেই। সে বোঝে না জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান। পরম স্নেহে ঘুম পাড়ানি গান শুনতে শুনতে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে যাওয়ার বয়স তার। কিন্তু এ বয়সেই তাকে মায়ের আদর-স্নেহ বঞ্চিত হতে হবে, কে জানতো? কয়েকটা দিন পেরিয়ে গেলেও মা ফেরেননি তুবার জন্য চকলেট নিয়ে। আর কখনোই ফিরবেন না। কিন্তু তুবা জানে, ‘‘মা চকলেট আনতে নিচে গেছে’’।

রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো তাসলিমা বেগম রেনুর (৪০) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রবিবার (২১ জুলাই) রাত সাড়ে ৮টার দিকে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

প্রতিদিনের মতই সেদিনও কাজে বের হন রেনু। আদরের সন্তানকে বলে গিয়েছিলেন ফেরার সময় চকলেট নিয়ে ফেরার কথা। মায়ের আনা চকলেট আর চিরন্তন ভালোবাসার অপেক্ষাতেই রয়েছে তুবা। কিন্তু এই অপেক্ষার প্রহর যে ফুরানোর নয়! মনে পড়লেই মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে অবুঝ শিশুটি। সে জানেই না, পৃথিবীতে তাকে আগলে রাখার মতো কেউই নেই।

জন্মের দেড় বছর পরেই পারিবারিক কলহে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। তারপর থেকে মায়ের কাছেই বড় হচ্ছিল সে। কিন্তু গুজব দানব কেড়ে নিয়েছে মমতাময়ীকেও।

মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) তুবার খালা কুসুম বেগম বলেন, “মাঝে-মধ্যেই বাচ্চটা মাকে খুঁজে বেড়ায়। তখন আমরা মা চকলেট আনতে গেছে বলে স্বান্তনা দেই। সে তো ছোট মানুষ, কিছু বুঝে না-মা একটু পর আসবে বলে অন্যদিকে মনযোগ ফিরিয়ে দেই। তারপর সে আবার খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার মা তাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এই ধাক্কা সে সইতে পারবে না। তাই মিথ্যা কথা বলে সময় পার করছি।”

তুবার বড় খালা নূরজাহান বেগম বলেন, “জন্মের পর থেকে আমাদের বাসাতেই থাকতো। ও তো কিছু বোঝে না, তাই মাঝে-মধ্যে মায়ের কথা বলে এমনিতে ভালোই আছে। তবে যে মা তার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, সেই মেয়ের আগামীটা ঘোর অন্ধকারই হয়ে রইল। এর বিচার কি দেশে হবে?”

নিহত তাসলিমার চাচাতো ভাই হারুন অর রশিদ বলেন, “আগামী বছরের জানুয়ারিতে বড়ভাই আলী আজগরের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার কথা ছিল রেনুর। মেয়েকে ভর্তির জন্য ওই স্কুলে খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন। গুজবে একেবারে পরপারেই চলে গেলেন তিনি। নির্মম মৃত্যু তাকে কেড়ে নিল না ফেরার দেশে।”

স্বজনরা জানান, রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় রেনুর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স। ৮টার দিকে জানাজা শেষে তাকে বাড়ির পাশে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

উল্লেখ্য, শনিবার সকালে রাজধানীর উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম রেনু নিহত হন। তার ১১ বছর বয়সী এক ছেলে ও চার বছর বয়সী এক মেয়ে রয়েছে। দুই বছর আগে স্বামীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে সন্তানদের নিয়ে মহাখলী ওয়ারলেস এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তিনি।

এঘটনায় বাড্ডা থানায় নিহতের বোনের ছেলে নাসির উদ্দিন টিটু অজ্ঞাত ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এখনপর্যন্ত ছয় সন্দেহভাজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।