• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:১৭ বিকেল

১১ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখনও ভয়াবহ, বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট

  • প্রকাশিত ১০:৪৭ রাত জুলাই ২৬, ২০১৯
কুড়িগ্রাম
বন্যায় ডুবে গেছে ঘর, টিনের চালে আশ্রয় নিয়ে ত্রানের অপেক্ষায় কুড়িগ্রামের একটি পরিবার। ফোকাস বাংলা

‘বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। এখন গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আয়-রোজগার করতে না পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন দুর্গতরা।’

এ পর্যন্ত দেশের ২৮ জেলা বন্যা প্লাবিত হলেও ১১ জেলার বন্যা পরিস্থিতি এখনও ভয়াবহ। এসব জেলার নদীগুলোতে পানি এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলাগুলো হচ্ছে—কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, জামালপুর, সিলেট, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, নাটোর, বগুড়া ও মৌলভীবাজার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম সদর, গাইবান্ধা সদর, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর ও শাহজাদপুর, সুনামগঞ্জ সদর, জামালপুরের ইসলামপুর, সিলেটের কানাইঘাট, জকিগঞ্জ ও বিয়ানিবাজার, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, নাটেরের সিংড়া, বগুড়ার সারিয়াকান্দি এবং মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তবে বন্যার প্রভাবে এসব জেলা-উপজেলার আশপাশের উপজেলা এবং এর আওতাধীন বহু ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খবর বাংলা ট্রিবিউনের।

জানা গেছে, বন্যায় এসব জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামোর। রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট ভেঙে গেছে। ভেসে গেছে ফসলী জমি, মাছের খামার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার অবকাঠামো।

বাংলা ট্রিবিউনের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ জেলার ৮৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৭টি ইউনিয়নের ৩০ হাজার ১৩৪টি পরিবারের এক লাখ ৫৩ হাজার ৭৮৫ জন মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। জেলায় গত কয়েকদিনে বজ্রাঘাত ও নৌকাডুবিতে সাত জন মারা গেছেন। জেলার ৬৭টি ইউনিয়নের সাত হাজার ৭৫টি ঘরবাড়ি বন্যায় বিনষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার চার হাজার ৪২৭টি টিউবওয়েল।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জামালগঞ্জ উপজেলা। এই উপজেলার সাত হাজার ৯৫০টি পরিবার বন্যাকবলিত হয়েছে। পুরো জেলায় এক হাজার ১১৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫৫৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জামালগঞ্জ সমিতি সুনামগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম আহমদ তালুকদার বলেন, “বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। এখন গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আয়-রোজগার করতে না পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন দুর্গতরা। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি সব মহলের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।”

জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউসুফ আল আজাদ বলেন, “জামালগঞ্জবাসীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে বন্যা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এছাড়া বন্যায় ভেঙে যাওয়া অবকাঠামো সংস্কার করা হবে।”

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ফরিদুল হক বলেন, “বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের সব বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পানি পুরোপরি নেমে যাওয়ার পর সংস্কার কাজ শুরু করা হবে।”

নওগাঁ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ জেলায় বন্যায় তিন হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। নওগাঁর ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ছয়টি নদী। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আত্রাই ও ছোট যমুনা। সম্প্রতি এই দুই নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ফসল পানিতে তলিয়ে যায়।

আত্রাইয়ের কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, “কাঁচা মরিচ, পটল, ধানের বীজতলাসহ কয়েকটি খেত বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। মাঠের পানি না কমায় নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে পারছি না।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মাহাবুবার রহমান বলেন, “বন্যার পানিতে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল আংশিক নিমজ্জিত হয়েছে। তবে কিছু কিছু এলাকার ফসল সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হওয়ায়, সে সব এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ একটু বেশি হয়েছে।”

জামালপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যমুনার পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি পাঁচ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় জামালপুরে পানিবন্দি হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ১৩ লাখ মানুষ। ভেঙে যায় প্রায় ৫৩ হাজার বসতবাড়ি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে এক হাজার ২৯৩টি। কাঁচা-পাকা রাস্তা ভেঙে গেছে প্রায় ৭০০ কি.মি.। ব্রিজ কালভাট ভেঙেছে ১৩৫টি।

এদিকে, লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন লালমনিরহাট প্রতিনিধি। তিনি জানান,দ্বিতীয় দফায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা নদীর পানি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোড্ডিমারীতে তিস্তা ব্যারাজের উজানে ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করায় তিস্তা নদীর দুই তীরবর্তী লালমনিরহাট ও নীলফামারীর বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে।