• বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৯ রাত

বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে বাংলাদেশ কি ব্যর্থ হতে যাচ্ছে?

  • প্রকাশিত ১০:৪২ রাত জুলাই ৩০, ২০১৯
বাঘ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন

যেখানে গত তিন বছরে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘ বেড়েছে ৮ শতাংশ, সেখানে একই সময়ে ভারতীয় অংশে বাঘ বেড়েছে ১৬ শতাংশ

বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার, বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা, বন ও বনভূমিহ্রাস, পরিবেশ বিপর্যয় ইত্যাদি নানা কারণে শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে মহাসংকটাপন্ন পশু বাঘ। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০১০ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত টাইগার সামিটে বাংলাদেশসহ ১৩টি বাঘসমৃদ্ধ দেশ (Tiger Range Country) ২০২২ সালের মধ্যেই নিজ নিজ দেশে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে একটি ঘোষণা দেন। বন বিভাগের তথ্যানুসারে, বাঘ দ্বিগুণ করতে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পে গত তিন বছরে বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ৮টি, শতকের হিসেবে মাত্র ৮ শতাংশ। অথচ একই সময়ে ভারতে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ৭৪১টি! এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ বন বিভাগ কি ব্যর্থ হতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশ ও ভারত, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির তুলনামূলক খতিয়ান

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত টাইগার সামিটের পর বিশ্বব্যাংক ছাড়াও সরকারি অর্থায়নে বাংলাদেশ বন বিভাগ সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ হাতে নেয়। Bengal Tiger Conservation Activity (Bagh) প্রকল্পের আওতায় ‘Second Phase Status of Tiger in Bangladesh Sundarbans 2018’ শিরোনামের একটি জরিপের পর গত মে মাসে বন বিভাগ জানায়, ৩ বছর সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১০৬টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১১৪টি, শতকের হিসেবে বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ। বন বিভাগ এ বিষয়টিকে সাফল্য বলে প্রচার করছে। কিন্তু বাংলাদেশ বন বিভাগের বাঘ বৃদ্ধির ঘোষণাটি কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে, যখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে!

গত ২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবসে ভারতের ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (এনটিসিএ) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালে ভারতে বাঘ ছিল ২২২৬টি। মাত্র ৩ বছরের ব্যবধানে সে সংখ্যা ৩৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৬৭টি! অর্থাৎ দেশটিতে ২০১৪ সালের তুলনায় বাঘ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ!


আরো পড়ুন -  আজ বিশ্ব বাঘ দিবস, বাঘ সম্পর্কে জেনে নিন কয়েকটি তথ্য


ভারতের বিশাল বনভূমির তুলনায় বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যদি শুধু সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির হিসেব করা হয় সেদিক দিয়েও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

দেশটির ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটির হিসেবে ২০১৪ সালে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে বাঘ ছিল ৭৬টি। তিন বছরের ব্যবধানে বাঘের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮টি। শতকের হিসেবে বৃদ্ধির হার প্রায় ১৬ শতাংশ। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, সুন্দরবনের ৬০ শতাংশই বাংলাদেশে পড়েছে। ভারতের তুলনায় সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যার দিক দিয়েও এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বৃহত্তর আয়তন ও বেশি সংখ্যক বাঘ থাকা সত্ত্বেও সংখ্যা প্রবৃদ্ধির হিসেবে বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

হাতে সময় তিন বছর

সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত টাইগার সামিটের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কথা। সামিটের ঘোষণা অনুযায়ী ভারত ইতোমধ্যেই তাদের বাঘের সংখ্যা ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি করে বেশ এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ লক্ষ্য অর্জনের মাত্র ৮ শতাংশ পথ পাড়ি দিয়েছে। অথচ সময় রয়েছে মাত্র তিন বছর। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন চলে আসে, লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ কি ব্যর্থ হতে যাচ্ছে?

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ গবেষক ড. মনিরুল এইচ খান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রকল্পে শুধু ভারত ও নেপালই ভালো করেছে, অন্যরা এখনো আশানুরূপ ফল দেখাতে পারেনি। বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতিতে রয়েছে সেখানে ২০২২ সালের মধ্যে বাঘ দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব।”

তবে সার্বিক কর্মকাণ্ডে বন বিভাগ ব্যর্থ হতে যাচ্ছে এমনটি মনে করেন না অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান। তিনি বলেন, “বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ হয়তো পিছিয়ে রয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, ভারত বাঘ সংরক্ষণে প্রকল্প নিয়েছে আমাদের অনেক আগে (১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে)। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুরুই করেছে মাত্র কয়েক বছর আগে। কাজ শুরুতে দেরী ও প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিবেশের সার্বিক বিবেচনায় বন বিভাগ ব্যর্থ হতে যাচ্ছে বলার সুযোগ নেই।”


আরো পড়ুন - বাঘ বেড়েছে সুন্দরবনে


অন্যদিকে বাংলাদেশ বন সংরক্ষক (অর্থ ও প্রশাসন) মো. জাহিদুল কবিরও মনে করেন ২০২২ সালে মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেটি বেশ আশাব্যঞ্জক। এটা ঠিক ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে না। তবে আমরা ২০২২ সালের লক্ষ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি, কিন্তু মূলত চেষ্টা করছি টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (বন বিভাগের নিজস্ব প্রকল্প) বাস্তবায়নের।”

জাহিদুল কবিরও মনে করেন না বন বিভাগ ব্যর্থ। এ বিষয়ে তার যুক্তি,  “১৯৭৩ সাল থেকে ভারত বাঘ সংরক্ষণে কাজ করে আসছে। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে তাদের সাফল্য টাইগার সামিটের পর গৃহীত উদ্যোগের নয়, বরং বহু আগেকার ফল। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, ২০১০ সাল পর্যন্ত আমরা জানতাম সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০টি থেকে ৪৫০টি। ঘনত্বের হিসেবে এ সংখ্যা খুবই সন্তোষজনক। তখন আমরা চেষ্টা করতাম বাঘের সংখ্যা যেন কমে না যায়। কিন্তু ২০১৬ সালে এসে আমরা জানলাম বাঘের সংখ্যা মাত্র ১০৬টি। মূলত তখন থেকেই বন বিভাগ বাঘের সংখ্যা বাড়াতে কাজ শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে বলা যায়, বাংলাদেশ কাজ করছে মাত্র তিন বছর। কিন্তু ভারত টাইগার সামিটের ঘোষণা বাস্তবায়নে কাজ করছে ৮ বছর। কাজেই তিন বছরে বাংলাদেশের অর্জনকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।”

জাহিদুল কবির বলেন, “আরেকটি বিষয় লক্ষ্যনীয়, বাংলাদেশে যে ১১৪টি বাঘই আছে সেটাও তো নিশ্চিত সংখ্যা নয়। সুন্দরবনের মাত্র তিনটি এলাকার ১৬৫৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় জরিপ করে আমরা এ সংখ্যা পেয়েছি। পুরো সুন্দরবন তো জরিপ করতে পারিনি। পুরো সুন্দরবন জরিপ করলে বাঘের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।”

কী আছে টাইগার অ্যাকশন প্ল্যানে, কী তার ভবিষ্যৎ?

রাশিয়ার টাইগার সামিটের ঘোষণা ছাড়াও বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ বন বিভাগ। এই কর্মপরিকল্পনা ‘বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮-২০২৭)’ নামে পরিচিত। টাইগার অ্যাকশন প্লানের কর্মসূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে সুন্দরবনের প্রতি ১০০ বর্গ কিলোমিটারে বাঘের সংখ্যার ঘনত্ব ২.১৭ থেকে ৪.৫০টি-তে বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়েছে। যা বর্তমান বাঘের সংখ্যার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। যথাযথ পদক্ষেপ নিলে বন বিভাগ গৃহীত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করেন বাঘ গবেষক মনিরুল এইচ খান।


আরো পড়ুন - বঙ্গবন্ধু জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন তানিয়া খান


এ বিষয়ে তিনি বলেন, “সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে সেটা খুব বেশি নিশ্চিত করে বলা না গেলেও বাঘের সংখ্যা যে কমে যায়নি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ কিছুটা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কাজেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সুন্দরবনে বাঘের ঘনত্ব বাড়াতে বন বিভাগ গৃহীত টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন অবশ্যই সম্ভব।”

টাইগার অ্যাকশন প্ল্যানের বিষয়ে বন সংরক্ষক মো. জাহিদুল কবির ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বাঘ সংরক্ষণের বিষয়টি শুরু করতেই আমাদের দেরী হওয়াতে ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না এটি মোটামুটি নিশ্চিত। সেক্ষেত্রে বন বিভাগ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং এক্ষেত্রে সাফল্য আশা করা যায়।”

বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে ড. মনিরুলের পরামর্শ

কি ধরনের উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে সে বিষয়ে প্রধানত তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন ড. মনিরুল এইচ খান।

ড. মনিরুলের মতে, “বাঘের সংখ্যা বাড়াতে গেলে প্রথমেই বাঘ ও হরিণের চোরা শিকারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। কেননা বাঘের সংখ্যা ব্যাপকমাত্রায় কমে যাওয়ার প্রধান কারণ চোরা শিকারি।”

দ্বিতীয়ত, “সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণ এলাকার পরিধি বাড়াতে হবে। সুন্দরবন ছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে অন্যান্য যে সব ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে তারমধ্যে ফরেস্ট করিডোর তৈরি করতে হবে। এতে বাঘের জন্য যেমন নতুন আবাসস্থল হবে তেমনি অন্যান্য পশুদের জন্যও বিষয়টি দারুণ ইতিবাচক হবে।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন বনেও বাঘের অস্তিত্ব রয়েছে জানিয়ে ড. মনিরুল আরো বলেন, “পার্বত্য বন সংরক্ষিত এলাকার বিস্তিৃতিও জরুরী।”