• সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৪ রাত

ডব্লিউএইচও বিশেষজ্ঞের মতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার উপায়

  • প্রকাশিত ০৭:৩৬ রাত আগস্ট ৬, ২০১৯
ডেঙ্গু
রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ডা. ভুপেন্দর নাগপাল ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এডিস মশা নিধনে সফল না হওয়ার কারণগুলো বিশদভাবে তুলে ধরেন। ছবি: ইউএনবি

‘ওষুধ প্রয়োগ আধা-শহুরে বা গ্রামীণ এলাকায় কাজ করতে পারে, কিন্তু শহর এলাকায় ব্যর্থ।’

সারাদেশে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। প্রতিদিন হাজারো রোগী ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু জ্বর, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ, বাহক এডিস মশা ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন তথ্য জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণপূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. ভুপেন্দর নাগপাল।

তিনি জানান, একটি নারী এডিস মশা একদিন পরপর রক্ত খায় এবং দিনের বেলা প্রয়োজনীয় রক্ত পেতে একদিনে ৫-১৭ জনকে কামড়ায়। আর যেহেতু আদর্শ পরিবেশে ৩০ দিনের মতো বেঁচে থাকতে পারে তাই পুরো জীবনকালে ৭৫ জনের অধিক মানুষকে আক্রান্ত করার ক্ষমতা রাখে।

এক মশায় অধিক মানুষ আক্রান্ত হওয়ার আরেকটি কারণ হিসেবে তিনি বলেন, একজন মানুষ যখন কামড় খেয়ে মশাটি মারতে যায় তখন সেটি উড়ে গিয়ে আরেকজনের ওপর বসে।

রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে (ডিজিএইচএস) সোমবার ( আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ডা. নাগপাল ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এডিস মশা নিধনে সফল না হওয়ার কারণগুলো বিশদভাবে তুলে ধরেন।

তিনি জানান, প্রাপ্তবয়স্ক এডিস মশা কখনো খোলা জায়গায় বিশ্রাম নেয় না। এর দরকার হয় আলো থেকে দূরে গরম ও আর্দ্র পরিবেশ। “এগুলো বিশ্রাম নেয় সোফার নিচে, বিছানার নিচে....কারণ এগুলোর দরকার অন্ধকার ও আর্দ্রতা।” এমন অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে রাস্তায় ধোঁয়ার মেশিনের মাধ্যমে কীটনাশক প্রয়োগ করে এডিস মশা মারা যাবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

“ডব্লিউএইচও ধোঁয়া প্রয়োগের সুপারিশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে,” জানিয়ে তিনি আরও বলেন যে এমশা বাড়ির ভেতরে থাকে এবং ওষুধের সংস্পর্শে আসে না। “ওষুধ প্রয়োগ আধা-শহুরে বা গ্রামীণ এলাকায় কাজ করতে পারে, কিন্তু শহর এলাকায় ব্যর্থ।”

মশাবাহী রোগ নিয়ে ৪০ বছর ধরে কাজ করা ডা. নাগপাল ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির প্রজনন বিষয়ে বলেন, এই মশা পানিতে ডিম পাড়ে বলে যেকথা প্রচলিত আছে তা ভিত্তিহীন। “এই মশা অনেক চালাক। একটি নারী এডিস মশা পাত্রের কানায় ডিম দেয়। আদর্শ পরিবেশে ডিমগুলো এক বছরের অধিক সময় পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।”

“যখন বন্যা হয় বা পাত্রটি পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে তখন দ্রুত ডিম ফুটে যায়। মশার বাচ্চা বা শুককীট ফুটতে সর্বনিম্ন দুই মিলিলিটার পানিই যথেষ্ট,” বলেন তিনি।

ডব্লিউএইচও বিশেষজ্ঞের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুযায়ী, একটি নারী এডিস মশা তার আশপাশের প্রতিটি পাত্রের কানায় ডিম পাড়ে। ডিম হয় মোট ৬০-১০০টি।

শুকনো পরিবেশে এসব ডিম অনেক দূরে পর্যন্ত স্থানান্তরিত হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করে দেন ডা. নাগপাল।

ডব্লিউএইচও’র তথ্য অনুযায়ী, অতীতের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের সব অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এক সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। “১৯৭০ সালের আগে মাত্র নয়টি দেশ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। বর্তমানে এতে ১২৬ দেশ আক্রান্ত হয়েছে,” বলেন কীটতত্ত্ববিদ ডা. ভুপেন্দর নাগপাল।

তবে, তথ্য-উপাত্তে দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা আকাশছোঁয়া হলেও রোগীদের মধ্যে মারা যাওয়া হ্রাস পেয়েছে। “২০১১ থেকে সবখানে ডেঙ্গু রোগ বাড়ছে কিন্তু মৃত্যুর হার কমছে...কারণ ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে,” যোগ করেন তিনি।

ডেঙ্গু সংক্রমণ রোধে রাস্তায় কীটনাশক প্রয়োগ নয়, বরং পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দেন ডা. নাগপাল। “ডেঙ্গু সংক্রমণ এড়াতে আপনার বাড়ি পরিষ্কার রাখা জরুরি।”

সেইসাথে তিনি অব্যবহৃত পাত্র ধ্বংস করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং তার পরামর্শ হলো- মশার ডিম ফুটা রোধ করতে খালি পাত্রগুলো সঠিকভাবে পরিষ্কার করতে হবে ও এমনকি উল্টো করে রাখতে হবে।

মশানিধনে এদের উৎস চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডব্লিউএইচও বিশেষজ্ঞ বলেন, এই চরম মুহূর্তে এটাই হলো সবচেয়ে ভালো উপায়।

সেইসাথে তিনি ধোঁয়ার জায়গায় অ্যারোসল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কারণ অ্যারোসল সহজে এডিস মশার বিশ্রামের জায়গায় পৌঁছাতে পারে।

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব প্রতিহত করতে পরিচ্ছন্নতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান ডা. নাগপাল।

তিনি ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিবহন, পুলিশ, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনসহ সরকারের সব সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দেন।

তার মতে, স্কুল, হাসপাতাল, শহরের ঘরবাড়ি, নির্মাণ এলাকা ও অফিসের মতো বিভিন্ন স্থাপনা পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা যায়।