• শনিবার, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:২১ সন্ধ্যা

এক টুকরো মাংস পেতে মাইলের পর মাইল পাড়ি, অধীর অপেক্ষা

  • প্রকাশিত ০২:৪৭ দুপুর আগস্ট ১২, ২০১৯
মাংসের জন্য অপেক্ষা
একটুকরো মাংস পাওয়ার আশায় বিত্তবানদের বাড়ির বাইরে অপেক্ষা ঢাকা ট্রিবিউন

কাটাকাটি শেষ হলেই গেট খুলে বাইরে অপেক্ষমাণদের এক টুকরো করে মাংস দেওয়া হবে

রিয়াজ, জুয়েল, ফারজানা, রুবিয়া, জাহিমা, সুহেল, সামছুদ্দিনদের বয়স তিন থেকে ১১-এর মধ্যে। এই সাত শিশুকে নিয়ে তাদের মা পারভীন আক্তার সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায় এসেছেন কোরবানির মাংসের আশায়। সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের উমেদশ্রী গ্রাম থেকে সুনামগঞ্জ কোরবানির মাংস সংগ্রহের জন্য ১০০ টাকা সিএনজি ভাড়া দিয়ে শহরের নুতনপাড়া এলাকায় এসেছেন পারভীন। 

সোমবার (১২ আগস্ট) কোরবানির দিন শহরে এসে নুতনপাড়া জনস্বাস্থ্য অফিসের সামনে তারা বসে আছেন কোরবানির মাংসের জন্য। কিন্তু তখন কেবল মাংস কাটাকাটির কাজ চলছে ভেতর বাড়িতে। তাই খোলা হচ্ছে না ধনীদের বাড়ির ফটক। ছোট গেটের সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছেন যাতে বাইরের কেউ ভেতরে যেতে না পারে। কাটাকাটি শেষ হলেই গেট খুলে বাইরে অপেক্ষমাণদের এক টুকরো করে মাংস দেওয়া হবে। 

পারভীন জানান, তাদের গ্রামে কোরবানি দেন খুব কম মানুষ। তাই গ্রাম থেকে যেটুকু মাংস পাওয়া যায় সেটুকু দিয়ে একবেলাও ঠিক করে রান্না হয় না। তাই সকাল সাতটা থেকে মুখ চেয়ে আছেন ধনীদের। 

একই জায়গায় ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াকুব উল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী জাহিমা (১১)। সে জানায়, আগে থেকে গেটের সামনে দাঁড়ালে মাংস পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। 

রঙ্গারচর ইউনিয়নের সফেরগাঁও গ্রামের দিনমজুর সেলিম মিয়া বলেন, ভোর থেকে পরিবারের লোকজন দিয়ে ৭০ টাকা দিয়ে ইজিবাইক চড়ে স্বপরিবারের শহরে এসেছেন। ঘরে চাল ডাল নুন তেল সব আছে কিন্তু মাংস নেই। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে মাংস সংগ্রহ করে রাতে সবাইমিলে খাবেন।

একটুকরো মাংসের জন্য অপেক্ষা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

গ্রাম থেকে শহরে কোরবানির মাংস নিতে আসা এসব মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারের ধানের দাম কম। সে তুলনায় গরুর দাম বেশি। তাই গতবারের তুলনায় এবার গ্রামে কোরবানি কম হয়েছে। সন্তানদের মুখে এক টুকরো মাংস তুলে দেওয়ার জন্যই তারা শহরে এসেছেন। 

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, সরকার ঈদের বিশেষ ভিজিএফ চাল দিলেও বাড়িবাড়ি ঘুরে কোরবানির মাংস সংগ্রহ করা ছাড়া দরিদ্র মানুষের বিকল্প উপায় নেই। বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় ধনীরা এগিয়ে এলে ধনী-গরিব সবাই কোরবানির মাংস খেতে পারতেন। 

জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়াম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. ইউসুফ আল আজাদ বলেন, হাওর এলাকায় দরিদ্র মানুষের বসবাস। তাদের রোজগার সীমিত। সবাই কোরবানি দিতে পারে না। এছাড়া, এসময় চলাচলের প্রধান উপায় নৌকা। অনেকের আবার নৌকাও নেই। তাই চাইলেও তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরবানির মাংস সংগ্রহ করতে পারেন না। এক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানদের  এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন তিনি।  

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীর বিশ্বাস বলেন, হতদরিদ্রদের মাঝে ইউনিয়র পরিষদের মাধ্যমে বিশেষ ভিজিএফ চাল বিতরণ করা হয়েছে। কোরবানির মাংসের ক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। 

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত ৯ হাজার ৬৩৮ জন তালিকা ভুক্ত খামারী রয়েছেন সুনামগঞ্জে। এসব খামারিরা ৫৯ হাজার ১০৯ টি পশু কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য তুলে ছিলেন। এগুলোর মধ্যে ষাঁড় ৩৫ হাজার ৮৫০টি, বলদ ১২ হাজার ৭৪৯ টি, গাভী ৫ হাজার ১৩টি, ছাগল ৩ হাজার ৩২৪টি, ভেড়া ১ হাজার ৩১৫টি। 

জেলার ১১টি উপজেলায় প্রায় ২৮ লাখ মানুষের বসবাস।