• শুক্রবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৬ রাত

চাঁদপুরে ধরা পড়েছে ভয়ংকর বিষধর ‘রাসেল ভাইপার’ সাপ

  • প্রকাশিত ০৮:১৬ রাত আগস্ট ২০, ২০১৯
চাঁদপুর
ভয়ংকর বিষধর রাসেল ভাইপার সাপ। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

এর এক ছোবলেই মৃত্যু নিশ্চিত। কারণ রাসেল ভাইপারে কামড়েছে অথচ বেঁচে গেছেন এমন উদাহরণ নেই বললেই চলে। আবার কেউ ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও এই সাপের বিষ ‘হেমোটক্সিন’ হওয়ায় মাংস পঁচেই আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়  

চাঁদপুর শহরের কোরালিয়া এলাকার একটি পুকুরের কচুরিপানার ওপর থেকে ধরা হয়েছে প্রায় ৩ ফুট লম্বা ভয়ংকর বিষধর ও বিরল প্রজাতির রাসেল ভাইপার সাপ। সাপটি ‘চন্দ্রবোড়া’ বা ‘উলুবোড়া’ নামেও পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Daboia russelii।

মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) বিকেলে সাপটিকে চাঁদপুরের বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে চট্রগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

সাপটি আটক করা সবুজ বেপারী নামের স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রবিবার দুপুরে তিনি তাদের বাড়ির পুকুর পাড় দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পান, সাপটি কচুরিপানার উপর বসে আছে। বিরল এই সাপটিকে তিনি কৌশলে ধরে বাড়িতে এনে খাঁচায় আটকে রাখেন। এলাকাবাসীও সাপটিকে দেখতে তার বাড়িতে ভীড় করেন। পরে এলাকার ছেলেরা সাপটির ছবি তুলে ফেইসবুকে পোস্ট করলে সেটি চট্রগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ভেনম রিসার্চ দলটির চোখে পড়ে। ঘটনাটি তারা স্থানীয় প্রশাসনকে জানান ও মঙ্গলবার চাঁদপুরে আসেন। সবুজ আরো জানান, মাসখানেক আগেও এমনই একটি সাপ তাকে দেখে তেড়ে আসলে তিনি সেটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিলেন।

রিসার্চ দলের সহকারি গবেষক মিজানুর রহমান জানান, চন্দ্রবোড়া সাপটি অনেক বিষধর। এটি ভারত, চীন,  থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার কয়েকটিদেশে আছে। বাংলাদেশের উত্তরঞ্চলের কিছু জেলায় এবং দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় রাসেল ভাইপার সাপটির অস্তিত্বমিললেও চাঁদপুরে এটি প্রথম।

তিনি বলেন, “এটি কামড় বসালে এর বিষ খুব দ্রুত মানব দেহের রক্তে ছড়িয়ে পড়ে, হৃদপিন্ড অল্প সময়ে অকার্যকরহয়ে পড়ে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্তএই সাপটির কামড়ে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।”

সাপটি জলে-স্থলে উভয় জায়গাতেই বাস করে। এর প্রধান খাবার ব্যাঙ, কাকড়া, মাছ। আবার স্থলে এরা হাস-মুরগি, ইদুর, বেজি পেলে খেয়ে ফেলে। অজগরের মতো এটি ধূসর তবে শরীরে কালো ছোপ ছোপ দাগ রয়েছে। সাপটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- চন্দ্রবোড়া ডিম দেয় না, সরাসরি বাচ্চা দেয়। এরা একসাথে ৬২/৬৩টি এমনটি ৮০টি পর্যন্ত বাচ্চা দিয়ে থাকে।

রাসেল ভাইপার সম্পর্কে বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জোহরা মিলা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাসেল ভাইপার বাংলাদেশে মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। অন্যান্য সাপ মানুষকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও এ সাপটি স্বভাব ঠিক তার উল্টো। তাই প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কেবল এ সাপটির কামড়েই প্রাণ হারান। আক্রমণের ক্ষিপ্র গতি ও বিষের তীব্রতার কারণে ‘কিলিংমেশিন’ হিসেবে বদনাম রয়েছে সাপটির।”

জোহরা মিলা বলেন, “তীব্রতার দিক দিয়ে সাপটি বিশ্বের ৫ নম্বর ভয়ংকর বিষধর সাপ। কিন্তু মাত্র ১ সেকেন্ডের ১৬ ভাগের ১ ভাগ সময়ে কাউকে কামড়ে বিষ ঢালতে পারে সাপটি! তাই কামড়ের ক্ষিপ্রগতির দিক দিয়ে সব সাপকে হারিয়ে রাসেল ভাইপার প্রথম স্থান দখল করেছে। তাছাড়া এ সাপটির বিষ দাঁত বিশ্বে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ। এ সাপের কোনো অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। বলা যায়, এর এক ছোবলেই মৃত্যু নিশ্চিত। কারণ রাসেল ভাইপারে কামড়েছে অথচ বেঁচে গেছেন এমন উদাহরণ নেই বললেই চলে। আবার কেউ ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও এই সাপের বিষ ‘হেমোটক্সিন’ হওয়ায় মাংস পঁচেই আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তাই সাপটির কবল থেকে বাঁচতে সচেতনতাই একমাত্র পথ।”

চাঁদপুর জেলা প্রশাসন থেকে আসা সহকারি কমিশনার (ভূমি) এমরান হোসাইন সজিব জানান, আমার ধারণা উত্তরাঞ্চলের পানি মেঘনা হয়ে নেমে আসার সময় সাপগুলো স্রোতে চাঁদপুরে চলে আসতে পারে।

বনবিভাগের কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, এই সাপ আমরা এই অঞ্চলে আগে কখনো দেখিনি। এদিকে এমন সাপ ধরা পড়ায় কোরালিয়া এলাকার মানুষ আতংকে রয়েছে।

চাঁদপুর সামাজিক বনায়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম বলেন, “সাপের খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের প্রতিনিধিরা চাঁদপুরে আসেন। তাদের কাছে সাপটি হস্তান্তর করা হয়েছে। এটি চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে রাখা হবে। তারা সেখানে গবেষণার কাজে লাগাবেন।”