• শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৭ সকাল

ফিরতে রাজি না হওয়ায় আবারও ভেস্তে গেলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া

  • প্রকাশিত ০৫:৫৬ সন্ধ্যা আগস্ট ২২, ২০১৯
রোহিঙ্গা
রোহিঙ্গাদের বহনের জন্য ৫টি বাস ও ৩টি ট্রাক অবস্থান করলেও কেউ ফিরতে রাজি হয়নি ঢাকা ট্রিবিউন

বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বহনের জন্য ৫টি বাস ও ৩টি ট্রাক অবস্থান করলেও কেউ যেতে রাজি না হওয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো পেছায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

নানা প্রস্তুতি থাকা স্বত্বেও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন হয়নি। এজন্য পিছিয়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া।বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কোন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে যেতে রাজি না হওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তবে, হতাশ না হয়ে এই চলমান প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বহনের জন্য ৫টি বাস ও ৩টি ট্রাক অবস্থান করলেও কেউ যেতে রাজি না হওয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো পেছালো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছিল। এজন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্প, কেরণতলী ট্রানজিট ক্যাম্প ও নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম ট্রানজিট ক্যাম্পসহ সব ধরণের প্রস্তুতিও নেয়া হয়। প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বাস, ট্রাক ও অন্যান্য সব সুবিধা। প্রত্যাবাসনের সময় নেয়া হয়েছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। তবে, কোনও রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি হয়নি।

বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৯০ রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে জানিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম জানান, “সাক্ষাৎকার দেওয়া রোহিঙ্গাদের কেউই মিয়ানমারে যাবেন না বলে

জানিয়েছে। তবে আমরা এই চলমান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখব। যাতে রোহিঙ্গারা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাদের দেশে ফিরে যায়।”

মোহাম্মদ আবুল কালাম আরও জানান, “মিয়ানমার সরকারের দেওয়া ছাড়পত্র অনুযায়ী এক হাজার ৩৭টি পরিবারের মোট তিন হাজার ৫৪০ জনকে ফেরত নেওয়ার প্রথম তালিকাটি দেওয়া হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। প্রত্যাবাসনের প্রস্ততি হিসেবে টেকনাফের কেরণতলী থেকে উখিয়া হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম এলাকা পর্যন্ত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত ছিল কিন্তু শেষপর্যন্ত প্রত্যাবাসন হয়নি।”

এদিকে, একইদিন দুপুরে রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ফিরে না যাওয়ার বিষয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন টেকনাফ উপজেলার শালবাগান ২৬ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান বজলুর ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, “আমাদের নাগরিকত্বসহ দাবিকৃত ৫টি শর্ত না মানলে কিছুতেই মিয়ানমার ফিরে যাবো না। আগে রাখাইনে বন্দি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাই। কারণ, রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারকে আমরা বিশ্বস করি না।”

তিনি বলেন, “আমরা রাখাইনে ফিরতে চাই, তবে ফিরে যাওয়ার মত পরিস্থিতি এখনও রাখাইনে সৃষ্টি হয়নি। মিয়ানমার সরকার এখনও মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর নানা ভাবে নির্যাতন করছে। এই অবস্থায় রাখাইনে যাওয়া মানে পুনরায় বিপদ ডেকে আনা। তাই আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় মিয়ানমার সরকারকে চাপে ফেলে আমাদের অধিকার ও শর্তগুলো আদায় করা হউক। তাহলে আমরা মিয়ানমার ফিরবো।”


আরও পড়ুন: ফিরে যেতে রাজি হননি কোনো রোহিঙ্গা


২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। তাদের সঙ্গে রয়েছেন ১৯৮২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া আরও অন্তত সাড়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গা। সবমিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। সেবছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, গতবছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজদেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।

সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই মাসে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল। ১৫ সদস্যের দলটি দুইদিন ধরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক করে। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তরফে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও চলাফেরায় স্বাধীনতার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছিল। রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় তখনও কাউকেই রাখাইনে পাঠানো সম্ভব হয়নি।