• মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৫ রাত

জাবি উন্নয়ন কেলেঙ্কারি: লেনদেনে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার অভিযোগ

  • প্রকাশিত ০৩:৩২ বিকেল আগস্ট ৩১, ২০১৯
জাবি
হল নির্মাণের উদ্দেশে কাটা হচ্ছে ১১৫০টি গাছ। মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

স্থাপনা নির্মাণ করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৫০০টি গাছ কেটে ফেলেছে যা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে

চলতি সপ্তাহে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের মধ্যে ২ কোটি টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ। এই টাকা আবার চলতি অর্থবছরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) পাস হওয়া বিশেষ উন্নয়ন তহবিলের টাকা। আর এর আগে কখনো এমন করে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো উপাচার্যকে (ভিসি) দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় জড়িত হতে দেখা যায়নি।

অনুসন্ধানে ঢাকা ট্রিবিউন নিশ্চিত হয়েছে যে, অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম তার অফিসে (বাসভবনের নিচতলা) ছাত্রলীগের কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাদের মধ্যে টাকা ভাগাভাগি সংক্রান্ত অন্তর্কোন্দল মীমাংসা করার চেষ্টা করেছেন।

ছাত্রলীগের অন্তর্কোন্দলেই টাকা ভাগাভাগির ঘটনা ফাঁস

ঈদুল আজহার মাত্র দুইদিন আগে, আগস্ট মাসের ৯ তারিখে ছাত্রলীগের তিনটি গ্রুপের সঙ্গে আলোচিত ওই বৈঠকে বসেন উপাচার্য ফারজানা ইসলাম। বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক ছাত্রলীগ নেতা জানান, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চলকে ৫০ লাখ টাকা করে দেয়ার কথা ছিল। উল্লেখ্য, জুয়েল রানা ও আবু সুফিয়ান চঞ্চল উভয়ই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারী।

তবে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ও সহ-সভাপতি নিয়ামুল হাসান তৃতীয়পক্ষ হিসেবে আর্বিভূত হয়ে গত ৭ আগস্ট এই ভাগাভাগির খবরটি গোলাম রাব্বানীর কাছে পৌঁছে দিলে পুরো পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়।

অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছর ছাত্রলীগের তিনটি পক্ষের মধ্যে হওয়া সংঘর্ষগুলোর সাথে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা সম্পর্ক রয়েছে।





 

হল নির্মাণের উদ্দেশে কাটা হচ্ছে ১১৫০টি গাছ। মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন


গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ওই বৈঠকে ঠিক হয়, সভাপতি জুয়েল রানা ৫০ লাখ, সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ২৫ লাখ এবং সাদ্দাম ও নিয়ামুল পাবেন ২৫ লাখ টাকা। একইসঙ্গে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি পাবে বাকি ১ কোটি টাকা।

যদিও, উপাচার্য ফারজানা ইসলাম টাকা ভাগাভাগির বিষয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সভাপতি জুয়েল রানা তার ভাগ থেকে ১৮ লাখ টাকা আল বেরুনী হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মওলানা ভাসানী হল, মীর মশাররফ হোসেন হল, শহিদ রফিক জব্বার হল ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হলে নিজ অনুসারীদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। এছাড়া তার নিজ হল আ. ফ. ম কামাল উদ্দিন এবং শেখ হাসিনা হলের কর্মীদের ব্যক্তিগতভাবে কিছু টাকা দিয়েছেন।

অন্যদিকে আবু সুফিয়ান তার ভাগের টাকা থেকে শহিদ রফিক জব্বার হলে ৪০,০০০ টাকা, আল বেরুনি হলে ৩০,০০০ টাকা ও মীর মশাররফ হলে ৩০,০০০ টাকা ভাগ করে দিয়েছেন।

আবার, সাদ্দাম ও নিয়ামুলের নেতৃত্বাধীন তৃতীয়পক্ষ ৯ লাখ টাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ও মওলানা ভাসানী হলে তাদের অনুসারীদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। এছাড়া আরো ৯ লাখ টাকা নিজেদের জন্য রেখেছেন। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এই গ্রুপটি ৬০,০০০ টাকা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিকেও দিয়েছে।

টাকা নিয়ে ছলচাতুরি

অবশ্য ঢাকা ট্রিবিউন এটা নিশ্চিত নয় যে, ভাগাভাগির ১ কোটি টাকা প্রকল্পের, না ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের। টাকাটি যদি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানেরও হয় সেটিও পরোক্ষভাবে তা সরকারি কোষাগারের টাকাই।

তবে, জুয়েল রানা ও আবু সুফিয়ান উভয়ই টাকা লেনদেনের অভিযোগটি জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। যদিও দু’জনেই ৯ আগস্টের বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে জানান, এটি ছিল বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব মীমাংসার বৈঠক।

আবু সুফিয়ানের মতো জুয়েল রানাও বলেন, “বৈঠকে ম্যাডামের (উপাচার্য) সঙ্গে টাকা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।”

এদিকে ঘটনা সঙ্গে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে শোভন ও রাব্বানীর সঙ্গে ঢাকা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সম্ভব হয়নি।





 

হল নির্মাণের উদ্দেশে কাটা হচ্ছে ১১৫০টি গাছ। মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন


গাছ কেটে উন্নয়ন

সরকার গতবছরের অক্টোবরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ১৪৪৫ কোটি টাকার উন্নয়ন তহবিল বরাদ্দ দেয়। এই টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সমস্যার সমাধান, লাইব্রেরি নির্মাণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজে ব্যয়ের কথা বলা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি দল তিনবছর ধরে কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের এই প্রকল্প পরিকল্পনা (স্থাপনার নকশা) তৈরি করেছে। এতে নতুন ২৩টি ভবন নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে। যদিও এই নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১১৫০টি গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়েছে যার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহম্মদ।

স্থাপনা নির্মাণ করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৫০০টি গাছ কেটে ফেলেছে যা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক খবির উদ্দিন বলেন, “তারা সেরকম একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারত সেখানে অতিরিক্ত গাছ কাটার প্রয়োজন হতো না। যদি ই-টেন্ডার দেওয়া হতো, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হতো, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকারও অপব্যবহার হতো না।”

একই বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জামাল উদ্দীন বলেন, “পরিকল্পনা হওয়া উচিত স্থপতির মাধ্যমে, পরিকল্পনাবিদ দিয়ে নয়।”

প্রসঙ্গত, প্রচুর গাছ, দুর্লভ পাখি, বন্যপ্রাণী ও কীটপতঙ্গের মাধ্যমে সৃষ্ট জীববৈচিত্র্যের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা সুনাম রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ১১৫০টি গাছ কাটার মাধ্যমে সেখানকার জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

উন্নয়ন কার্যক্রমে দুর্নীতির অভিযোগে টিআইবি’র উদ্বেগ

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভে একাত্মতাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

এবিষয়ে টিআইবির দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাবি’র ছাত্রাবাস নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্থান নির্ধারণ, গাছ অপসারণ, উন্নয়নকাজের দরপত্র-প্রক্রিয়ায় অনৈতিক লেনদেন ও ভাগবাটোয়ারাসহ গুরুতর অনিয়ম, স্বচ্ছতার ঘাটতি ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে এর বিরুদ্ধে বিচারের দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী আশানুরূপ জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।”

বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি ‘অপরিকল্পিত উন্নয়ন’ কার্যক্রম বিষয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি দূর এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিতেরও আহ্বান জানায় সংস্থাটি।