• শনিবার, জুন ০৬, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০০ রাত

শকুন সংরক্ষণে বাংলাদেশ, কী করছে সরকার?

  • প্রকাশিত ০৬:০৩ সন্ধ্যা সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯
শকুন
বাংলাদেশের শকুন। ছবি : সৈয়দ জাকির হোসেন/ ঢাকা ট্রিবিউন

এমন দুর্যোগ চলমান থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যেই দেশ থেকে হারিয়ে যাবে শকুন।  

মানবসৃষ্ট নানা কারণে পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই ধ্বংস হচ্ছে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য। বাংলাদেশ এক সময় জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এরইমধ্যে ধ্বংস হয়েছে বিপুল বনভূমি, বিলুপ্ত হয়েছে অসংখ্য পশু-পাখি, বন্যপ্রাণী। মানবসৃষ্ট কারণেই দেশে অস্তিত্ব রক্ষায় সংগ্রাম করে যাচ্ছে আরেকটি বন্যপ্রাণী, শকুন। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচারের (আইইউসিএন) তথ্যানুযায়ী, শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে দ্রুততম বিলুপ্ত হতে চলা প্রাণী প্রজাতি হচ্ছে শকুন। 

দেশে টিকে আছে শুধু বাংলা শকুন

পৃথিবীতে শকুনের ১৮টি প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে ৭টি প্রজাতির শকুনের অস্তিত্ব ছিল। এরমধ্যে বাংলা শকুন (White-rumped Vulture), হিমালয়ী শকুন (Himalayan Griffon), সরু-ঠুঁটি শকুন (Slender-billed Vulture) ও রাজ শকুন (Red-headed Vulture) ছিল এদেশের আবাসিক পাখি। যারমধ্যে দেশে একমাত্র বাংলা শকুনটিই (বৈজ্ঞানিক নাম Gyps bengalensis) টিকে আছে, অন্যরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে দেখা যেত এমন শকুনের অন্য তিনটি প্রজাতি হচ্ছে- কালো শকুন (Cinereous Vulture), ইউরেশীয় শকুন (Eurasian Griffon) ও শ্বেত শকুন (Egyptian Vulture)। এরা মূলত পরিযায়ী (migratory) হিসেবে শীত মৌসুমে কখনো কখনো বাংলাদেশে আসে। 


আরো পড়ুন - সুন্দরবন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মৃতদেহ উদ্ধার


বন বিভাগ ও আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে ১০ লাখ শকুন ছিল। কিন্তু মাত্র একযুগের ব্যবধানে ৯৯.৯৯ ভাগ কমে ২০১২ সালে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৫০টিতে! আইইউসিএনের সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে শকুনের সংখ্যা মাত্র ২৬৮টি! পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সারাবিশ্বে শকুনকে ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) ঘোষণা করেছে আইইউসিএন।

শকুন বিলুপ্তির কারণ

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ অব ভেটেনারি মেডিসিনের অধ্যাপক লিন্ডসে ওক তার এক গবেষণায় দেখতে পান, শকুন বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে গবাদিপশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেনের ব্যবহার। এই ওষধু ব্যবহারের পর পশুটির মৃত্যু হলেও মৃত পশুর দেহে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়ে যায়। শকুন ওই মৃত খাওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ওষুধের প্রভাবে মারা যায়।

লিন্ডসের গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র শূন্য দশমিক ২২ মিলিগ্রাম ডাইক্লোফেনাক একটি শকুনের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ঠ। ১৯৮০ দশকে ওষুধটি ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সস্তায় পাওয়া যায় বলে গবাদিপশুর প্রায় সব রোগেই এই ওষুধটি কৃষকেরা ব্যবহার করতে থাকেন, ফলে দলে দলে মারা যেতে থাকে শকুন। কিন্তু ভারতীয় ভেটেনারি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, গবাদিপশুর যেসব রোগ হয় তার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেনের ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। 

এ ছাড়া আইইউসিএনের সহযোগী সংগঠন বার্ডসলিস্ট অর্গানাইজেশনের মতে, অতিরিক্ত কীটনাশক ও সারের কারণে পানি দূষণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া, বিমানের সাথে সংঘর্ষ,কবিরাজি ওষুধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার ইত্যাদি কারণে প্রতিবছর শকুনের ব্যাপক প্রাণহানি হয়। এ ছাড়া খাদ্য সংকট, নিম্ন জন্মহার, বিভিন্ন কারণে বট, পাকুড়, শেওড়া, শিমুল, ছাতিম, দেবদারু, অশ্বত্থ, কড়ই, তেঁতুল, অর্জুন, পিপুল, নিম, তেলসুর ইত্যাদি বড় গাছ ধ্বংসের কারণে বাসস্থানের প্রচণ্ড সংকটও শকুন বিলুপ্তির অন্যতম কারণ।


আরো পড়ুন - বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে বাংলাদেশ কি ব্যর্থ হতে যাচ্ছে?


তবে ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেনের, খাদ্য সংকট এবং বাস উপযোগী বড় গাছ ধ্বংসই বাংলাদেশে শকুন অবলুপ্তির প্রধান তিনটি কারণ বলে মনে করেন আইইউসিএননের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাকিবুল আমিন। 

পাখি বিজ্ঞানীদের মতে, শকুনের ওপর এমন দুর্যোগ চলমান থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যেই দেশ থেকে হারিয়ে যাবে শকুন।  

কেন সংরক্ষণ প্রয়োজন

শকুন বাংলাদেশের স্থায়ী পাখি। হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতি থেকে মৃতদেহ সরিয়ে রোগপ্রতিরোধ ও পরিবেশকে সুরক্ষা দিচ্ছে শকুনই। এ কারণেই শকুনকে প্রকৃতির ঝাড়ুদার বলা হয়। শকুন আকাশে উড়ে বেড়ানোর সময় নিচের সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পায় বলে প্রাণীর মৃতদেহ দেখে নেমে আসে। একদল শকুন মাত্র ২০ মিনিটে একটি গরুর মরদেহ খেয়ে শেষ করে দিতে পারে।  

প্রশ্ন উঠতে পারে, পশু-পাখির মৃতদেহ তো শেয়াল-কুকুর-কাক খাচ্ছে, তবে শকুনের প্রয়োজন কেন?

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বার্ডক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও শকুন সংরক্ষণ জাতীয় কমিটির সদস্য ইনাম আল হক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “মৃত গবাদি পশু-পাখিতে থাকা অ্যানথ্রাক্স, কলেরা, যক্ষ্মা, ক্ষুরা রোগের জীবাণু শকুন ব্যতীত অন্যকোনো পশু-পাখির পেটে হজম হয় না, বরং মল-মূত্র ত্যাগের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু শকুনের পেটে বিশেষ এক ধরনের জারক রস থাকায় তা খুব সহজেই হজম হয়। ফলে এসব রোগে ঝুঁকি থেকে রক্ষা পায় মানুষ। কিন্তু শকুনের এই ক্রমহ্রাসমান অবস্থার জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি এসব রোগের প্রকোপ আবারও বাড়ছে, ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জীববৈচিত্র্য।”


আরো পড়ুন - মুন্সীগঞ্জে ‘বাঘের’ ঘোরাফেরা, আসল রহস্য কী?


ড. ইনাম আল হক বলেন, “এটা মনে হতে পারে যে, শহর এলাকায় মরা পশু-পাখি সিটি কর্পোরেশন আর গ্রাম এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বন-বাদারে যেসব বন্যপ্রাণী মরছে সেসব সরাবে কে? এই দায়িত্ব শকুনই পালন করে, সুস্থ রাখে বনের পরিবেশ, বজায় রাখে ভারসাম্য।”

দেশে দেশে শকুন সংরক্ষণ

আইইউসিএনের হিসেবে, পৃথিবীর প্রায় ৯০ ভাগ শকুন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আশির দশকে শুধু সার্কভুক্ত দেশগুলোতেই শকুন ছিল প্রায় ৪ কোটি। বর্তমানে তা কমে ৪০ হাজারে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে শকুনের সবগুলো প্রজাতিতে ‘মহাবিপন্ন (Critically Endangered) ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া শকুন টিকিয়ে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। 

আমাদের প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, নেপাল বহু আগেই শকুন সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধু এই পাখিটি বাঁচাতে ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেনের উৎপাদন ও আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে বিকল্প ওষুধ মেলোক্সিক্যান ব্যবহার শুরু করেছে। 

শকুনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে নেপাল সরকার ‘ভালচার রেস্টুরেন্ট’নামে শকুন খাবার সরবরাহ করছে। অন্যদিকে ক্যাপটিভ ব্রিডিংয়ে দারুণ সফলতা পেয়েছে ভারত। এ ছাড়া মৃত প্রাণীকে সৎকার না করে শকুনের ফেলে রাখার নীতি নিয়েছে স্পেন সরকার।

কী করছে সরকার?

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের নেতৃত্বে ২০০৬ সালে শকুন সংরক্ষণ আন্দোলনের শুরু হয়। এই আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল শকুনের মরণঘাতী ডাইক্লোফেনাক উৎপাদান, আমদানি ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা। বার্ড ক্লাবের আন্দোলনে সাড়া দিয়ে ২০১০ সালে আইন করে ডাইক্লোফেনাক উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করে সরকার। 


আরো পড়ুন - বাঘ বেড়েছে সুন্দরবনে


শকুন সংরক্ষণে সরকার বা বন বিভাগের পক্ষ থেকে কী ধরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে বন সংরক্ষক (অর্থ ও প্রশাসন)মিহির কুমার দো ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “শকুনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ, শকুনের সংরক্ষিত এলাকা (Vulture SAVE Zone) গঠন ও আবাসস্থল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে বন বিভাগ ও আইইউসিএন যৌথভাবে শকুন সংরক্ষণে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে যার সফলতা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। এ ছাড়া শকুন সংরক্ষণের একটি নীতিমালা (Vulture Action Plan) তৈরি করা হয়েছে।”

তারপরও শকুন সংরক্ষণে বন বিভাগের এসব উদ্যোগ যথাযথ কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মিহির কুমার দো বলেন,“শুধু সরকারের একার পক্ষে শকুন সংরক্ষণ যথাযথভাবে সম্ভব না। এ জন্য পাখিটির বিচরণ এলাকার মানুষেরও সচেতনতা প্রয়োজন। ২০১৪ সালে সুন্দরবন ও সিলেটের ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে শকুনের জন্য নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার। আমরা আশা করছি শকুনের সুদিন ফিরে আসবে।”

শকুন রক্ষায় বন বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে আইইউসিএন। হবিগঞ্জের রেমাকালেঙ্গায় শকুনের জন্য একটি ফিডিং সেন্টার খুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে শকুনের খাবার সরবরাহের পাশাপাশি পরিচর্যা ও বিশ্রামের জায়গাও তৈরি করেছে আইইউসিএন। প্রতিষ্ঠানটির প্রচেষ্টায়্ ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি বাচ্চা দিয়েছে মা শকুনেরা। 

শকুনের বিলুপ্তির ঠেকাতে বাংলাদেশ সঠিক পথে আছে বলে মনে করেন আইইউসিএননের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাকিবুল আমিন।  ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, "শকুন সংরক্ষণে বাংলাদেশের উদ্যোগ খুবই সময়োপযোগী। কিন্তু ডাইক্লোফেনাকের মতোই শকুনের জন্য  প্রাণঘাতী  আরো একটি ওষুধ  কেটোপ্রোফেনও নিষিদ্ধ করা জরুরী।  এছাড়া শকুনের বিচরণ এলাকায় বড় বড় গাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও সচেতন করতে হবে। তবেই প্রকৃতিতে ফিরে আসবে শকুন।"


আরো পড়ুন - আমাকে কেউ কবি বলে না, দুঃখ করে বলেছিলেন এরশাদ


বর্তমান পরিস্থিতিতে শকুনের ক্যাপটিভ ব্রিডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে রাকিবুল আমিন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "শকুন রক্ষায় আইইউসিএন দারুণ  সাফল্য পেয়েছে। যেহেতু মুক্ত পরিবেশেই শকুনের বংশবৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে সেহেতু এখনই ক্যাপটিভ ব্রিডিংয়ের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করছি না।  তাছাড়া সেটি করতে অনেক খরচেরও বিষয় আছে। আরো কিছু দিন গেলে, শকুনের সংখ্যা আরো বাড়লে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।  তবে এটা ঠিক, প্রকৃতিতে শকুন ফিরিয়ে আনার সাফল্যের বিষয়ে আমরা   খুবই আশাবাদী।"

56
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail