• বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩০ দুপুর

রিফাত হত্যাকাণ্ডের নতুন ভিডিও প্রকাশ, স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির আপ্রাণ চেষ্টা

  • প্রকাশিত ১০:৫৪ রাত সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯
বরগুনা
প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের সামনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বরগুনা জেলা পুলিশের পৃথক দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। নতুন পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজটি এই দুটি ক্যামেরার যে কোনো একটির

রগুনার আলোচিত শাহনেওয়াজ রিফাত(রিফাত শরীফ) হত্যাকাণ্ডের নতুন একটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। বরগুনার সদর জেনারেল হাসপাতালের প্রবেশদ্বারের একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে দেখে গেছে, বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীদের কোপে আহত হওয়ার পর তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি একাই রক্তাক্ত অবস্থায় রিকশাযোগে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এসময় মুমূর্ষু স্বামীকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা যায় তাকে। 

সোমবার(১৬ সেপ্টেম্বর) পাওয়া নতুন এই সিসিটিভি ফুটেজ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের সামনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বরগুনা জেলা পুলিশের পৃথক দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। নতুন পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজটি এই দুটি ক্যামেরার যে কোনো একটির। 

সম্প্রতি প্রকাশিত এই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার দিন অর্থাৎ ২৬ জুন সকাল ১০টা ২১ মিনিটের সময় রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় রিফাতকে রিকশাযোগে হাসপাতালে নিয়ে যান মিন্নি। এসময় সেখানে উপস্থিত এক যুবক যুবক রিফাতকে বহনকারী রিকশার দিকে দৌঁড়ে যান। রিফাতের অবস্থা দেখে তিনি দৌড়ে হাসপাতালের ভিতরে গিয়ে একটি স্ট্রেচার নিয়ে রিকশার পাশে আসেন। ইতোমধ্যে উপস্থিত অনেকেই সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। রিকশা থেকে নামিয়ে আহত রিফাতকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর মিন্নি হাসপাতালের সামনে উপস্থিত একজনের মুঠোফোন থেকে কল দিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলেন। কিছুক্ষণ পর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর ও চাচা আবু সালেহ হাসপাতালে আসেন।


আরও পড়ুন- জামিনে মুক্তি পেলেন মিন্নি


সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে হাসপাতালের সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স আসে। এসময় সেখানে রিফাত শরীফের বন্ধু মঞ্জুরুল আলম জন ও তার কয়েকজন বন্ধু হাসপাতালে আসেন। বেশ কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলতে দেখা যায় জনকে। 

১০টা ৪৪ মিনিটে অক্সিজেন ও দুটি স্যালাইন লাগানো অবস্থায় রিফাত শরীফকে স্ট্রেচারে করে ওই অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। ১০টা ৪৯ মিনিটে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ছেড়ে যায় অ্যাম্বুলেন্সটি।

উল্লেখ্য, এর আগেও রিফাত হত্যাকাণ্ডে দুটি ভিডিও ভাইরাল হয়। রিফাত শরীফকে ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার প্রথম ভিডিওতে দেখা যায়, রিফাতকে সন্ত্রাসীরা যখন কোপাচ্ছিল, তখন তাঁর স্ত্রী আয়শা প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন স্বামীকে রক্ষার। এরপর ওই ঘটনায় দ্বিতীয় যে ভিডিওটি প্রকাশিত হয়, সেখানে রিফাতকে কলেজ গেট থেকে ধরে পূর্ব দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় আয়শার সন্ত্রাসীদের পেছনে কিছুটা ধীরগতিতে হেঁটে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে একটি মহল। এই সন্দেহের জের ধরেই মিন্নির শ্বশুর ঘটনার ১৮ দিন পর গত ১৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে রিফাত হত্যায় মিন্নি জড়িত বলে অভিযোগ তোলেন এবং ওই ভিডিওর উদ্ধৃতি দেন। ১৬ জুলাই আয়শাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গ্রেফতার করা হয়। উচ্চ আদালত থেকে গত ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হয়ে বর্তমানে বাবার বাড়িতে আছেন মিন্নি।


আরও পড়ুন- মিন্নির বাবা : মিন্নিকে যারা জড়াচ্ছে তাদের বিচার আল্লাহ করবেন


নতুন ভিডিও প্রসঙ্গে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, “পুলিশ শুরু থেকেই প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশ করে আমার মেয়েকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। তাই তারা এই ভিডিওটিকে প্রকাশ্যে আসতে দেয়নি। আমি নিজেই একটি মাধ্যমে ভিডিওটি সংগ্রহ করি। এখানে সকলেই স্পষ্ট দেখেছে রিফাত কে নিয়ে মিন্নি একাই হাসপাতালে এসেছিলো। আমি শুরু থেকেই বলে এসেছি, আমার মেয়ে এই হত্যাকাণ্ডে সঙ্গে জড়িত নয়। আমার মেয়েকে ষড়যন্ত্র করে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমার মেয়েকে ফাঁসানোর জন্য কলেজের সামনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছিলো আর হাসপাতালের সামনের এই ভিডিওটিকে আড়াল করা হয়েছিলো। এখন সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার। আমার মেয়ে নির্দোষ।”

এবিষয়ে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, নতুন যে ভিডিওটি পাওয়া গেছে সেটি আমিও দেখেছি। এতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় মিন্নি তাঁর স্বামীকে রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ এই ভিডিওর বিষয় উল্লেখ না করলে সে প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ হবে বলে দাবি করেন তিনি।


আরও পড়ুন- রিফাত হত্যাকাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত শ্রাবণের জামিন


রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা  ও বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা মিন্নির বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডে মিন্নির জড়িত থাকার যেসব প্রমাণ পেয়েছি, সেগুলো আদালতে দাখিল করেছি। এখন নতুন করে কোনো ভিডিও বের হয়েছে কি না, সেটা আমাদের জানা নেই। তবে নতুন কোন ভিডিও প্রকাশ হয়ে থাকলে আমরা সে বিষয়েও খোঁজ নিয়ে দেখবো। 

মিন্নিকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তে যেভাবে এসেছে আমরা বিষয়টি সেভাবেই দেখছি। এখানে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁসানো হচ্ছে না। 

প্রসঙ্গত, বরগুনার আলোচিত এ হত্যা মামলায় গত ১ সেপ্টেম্বর আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় পুলিশ। একইসঙ্গে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতারে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। গ্রেফতারদের মধ্যে ৬ কিশোর অপরাধী শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে রয়েছে। আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ জামিনে রয়েছেন ২ জন।


আরও পড়ুন- কেন খুন হলেন রিফাত?


প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি হামলাকারীদের সঙ্গে লড়াই করেও তাদের দমাতে পারেননি। গুরুতর আহত রিফাতকে ওইদিন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ ও পাঁচ-ছয় জনকে অজ্ঞাত আসামি করে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। 

ভিডিও-