• বুধবার, নভেম্বর ১৩, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৪৪ রাত

সম্রাট: ঢাকার ক্যাসিনো বাদশা

  • প্রকাশিত ০১:১৮ দুপুর সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯
ইসমাইল হোসেন সম্রাট
ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট। মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ঢাকার বেশ কয়েকটি ক্লাবে ক্যাসিনো ব্যবসা চলে সম্রাটের ইশারায়

ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাসিনো ও জুয়াবিরোধী অভিযানের পরপরই "ক্যাসিনো সম্রাট" হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের নাম উঠে এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

সম্প্রতি র‍্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া অবৈধ ক্যাসিনোর মালিক এবং ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার ‘গুরু’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে সম্রাটের নাম।

জানা গেছে, সম্রাট একজন পেশাদার জুয়াড়ি। জুয়া খেলতে বড় একটি সময় তিনি দেশের বাইরে থাকেন। এসময় তার সঙ্গ দেন যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতা। এছাড়া ঢাকার বেশ কয়েকটি ক্লাবে তার ছত্রছায়ায় ক্যাসিনো ব্যবসা চলে বিভিন্ন খবরে উঠে এসেছে। বিনিময়ে সম্রাট নেন মোটা অঙ্কের চাঁদা।

সারাদেশে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ও পুলিশের চলতি জুয়াবিরোধী কঠোর অভিযান এবং ক্যাসিনোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের এমন বক্তব্যের পর সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হবে কিনা এমন প্রশ্ন অনেকেরই।

রাজনীতিতে যেভাবে ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন সম্রাট

সম্রাট রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ১৯৯০ সালে। তখন অবিভক্ত ঢাকা ছাত্রলীগের একজন নেতা ছিলেন তিনি। সেসময় দেশজুড়ে চলছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলন। সম্রাট রাজধানীর রমনা অঞ্চলে আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। একারণে তখন তাকে নির্যাতনসহ জেলও খাটতে হয় তাকে।


আরও পড়ুন : জি কে শামীমের অজানা কাহিনী


১৯৯১ সালে এরাশাদের পতনের পর ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। সে আমলে সম্রাটের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়। এরপর ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি যুবলীগের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। ১/১১'এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সময় সম্রাট যুবলীগের প্রথমসারির নেতা ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পর নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকেই রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশীল হতে থাকেন সম্রাট। দলীয়ভাবে পদোন্নতিও হয় তার। আওয়ামী লীগের বড় বড় সব অনুষ্ঠানে পরিচিত মুখ হিসেবে উপস্থিত থাকতেন সম্রাট। দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কর্মীদের নিয়ে শোডাউনও করতে দেখা যায় তাকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্রাটের নেতৃত্বাধীন ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগকে সেরা ঘোষণা করেন যুবলীগ বর্তমান সভাপতি মো. ওমর ফারুক।

নিজ এলাকায় সম্রাটের প্রভাব

সম্রাটের পৈত্রিক নিবাস ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের পূর্ব সাহেবনগর গ্রামে। তার বাবার নাম ফায়েজ উদ্দীন চৌধুরী। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সম্রাট সবার বড়। সাধারণত, ফেনীতে নিজের এলাকায় বিপুল সংখ্যক কর্মীদের নিয়ে সফর করেন সম্রাট। এছাড়া স্থানীয়ভাবে আর্থিক সহযোগীতা; বিশেষ করে স্থানীয় মসজিদ ও মাদরাসার বড় দাতা হিসেবে খ্যাতি রয়েছে তার।

জানা গেছে, সম্রাটের ফেনী ভ্রমণের সময় সফরসঙ্গী হিসেবে যুবলীগের আরেক নেতা আরমানুল হক আরমান তার সঙ্গে সবসময় থাকেন। তিনিও উঠে এসেছেন ফেনী থেকে। সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, সম্রাটের আর্থিক লেনদেনগুলো করে থাকেন আরমান।


আরও পড়ুন :  কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি ফিরোজ ১০ দিনের রিমান্ডে


ঠিকাদার হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে আরমানের। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দিতে তাকে সম্রাট সহযোগীতা করেন বলেও জনশ্রুতি আছে। এমনকি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্রাটকে ফেনীতে খালেদা জিয়ার পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন ফেনী আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের একাধিক নেতা।

সম্রাটের ওপর শেখ হাসিনার অসন্তোষ

২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন যুবলীগের বেশকয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা। এসময় সম্রাটের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

সম্রাটের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও একটি দাতব্য সংস্থার ভবন নির্মাণের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে সেদিন ঢাকা দক্ষিণের যুবলীগ কমিটি ভেঙে দেওয়ারও নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ প্রধান। এঘটনার সময় যুবলীগের সভাপতি মো. ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হারুন-অর-রশিদ উপস্থিত ছিলেন।

সম্রাট-একজন 'ক্যাসিনো সম্রাট'?

চলতি মাসের ১৯ তারিখ ঢাকায় অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন দক্ষিণ যুবলীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া। চার মামলায় তাকে রিমান্ডে নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ব্যবসায় খালেদের ‘গুরু’ হিসেবে পরিচিতি রয়েছে সম্রাটের। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে সম্রাটকে ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ হিসেবে উল্লেখও করা হয়েছে।


আরও পড়ুন : রাজধানীতে যুবলীগ নেতার ‘ক্যাসিনো’তে র‌্যাবের অভিযান


সম্রাট একজন পেশাদার জুয়াড়ি এবং একারণে সিঙ্গাপুরে তার যাতায়াত আছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে। মাসের এক-তৃতীয়াংশ সময় তিনি জুয়া খেলতে সিঙ্গাপুরে কাটান বলে নানা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। সেখানের মারিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে সম্রাট একজন বিশিষ্ট জুয়াড়ি বলে জানা গেছে। সিঙ্গাপুরে পৌঁছালে বিমানবন্দর থেকে সম্রাটকে বিলাসবহুল লিমুজিন গাড়িতে করে তাকে ওই ক্যাসিনোতে নিয়ে যাওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে সফরের সময় আরমান ও মোমিনুল হক মোমিনসহ যুবলীগের একাধিক নেতা সম্রাটের সঙ্গ দেন বলেও অভিযোগ আছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ঢাকার বেশকয়েকটি ক্লাবে ক্যাসিনো ব্যবসা চলে সম্রাটের ইশারায়। সেখান থেকে নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করেন তার সহযোগীরা। একাজ চালিয়ে যেতে প্রভাবশালীদের টাকা দিয়েও হাত করতেন তিনি।