• মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫০ রাত

কালের সাক্ষী চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা মসজিদ

  • প্রকাশিত ০৯:০৬ রাত সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯
অন্দরকিল্লা মসজিদ
চট্টগ্রামের অন্দরকিল্লা মসজিদ। ছবি : ঢাকা ট্রিবিউন

বৃটিশ শাসনামলে মসজিদটিকে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ৩৫২ বছর ধরে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। আরাকানি মগ এবং পর্তুগীজ জলদস্যূদের বিরুদ্ধে মুঘলদের জয়লাভের স্মারক হিসেবে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।

সময়ের সাথে এটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান হয় উঠেছে। বর্তমানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ধর্মীয় ইবাদতের পাশাপাশি মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলী উপভোগ করার জন্য আন্দরকিল্লায় ভিড় করেন।

আন্দরকিল্লার ইতিহাস

আব্দুল করিম বিদ্যাবিশারদ তার 'ইসলামাবাদ' শীর্ষক গ্রন্থে পর্তুগীজ ও মগদের বিরুদ্ধে মুঘলদের বিজয় এবং আন্দরকিল্লা মসজিদের নির্মাণকাজের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন।

ওই গ্রন্থে আন্দরকিল্লাকে তিনি বন্দরনগরীর সবচেয়ে পুরানো মসজিদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ওই গ্রন্থানুসারে, শায়েস্তা খার সুবেদারি আমলে চট্টগ্রাম ছিল আরাকান মগ এবং পর্তুগীজ জলদস্যূদের দখলে। তারা চট্টগ্রাম শাসন করলেও প্রায়শ বাংলার ভেতরে প্রবেশ করে লুটপাট চালাতেন।  

এসব ব্যাপারে তিতিবিরক্ত হয়ে শায়েস্তা বাংলার মাটি থেকে আরাকান মগ ও পর্তুগীজদের বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৬৬৫ সালে তৎকালীন আরাকানদের ঘাটি চট্টগ্রামে সামরিক অভিযান শুরু করেন। সামরিক অভিযান পরিচালনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় শায়েস্তা খার বুজুর্গ উমেদ খানকে।   

এটা ছিল এমন একটা সময় যখন পর্তুগীজদের সাথেও আরাকানরা বিবাদে লিপ্ত ছিল। তাই যুদ্ধ শুরুর পর  পর্তুগীজরাও পরে মুঘল সেনাদের সাথে হাত মেলায়। ফলে আরাকানদের খুব সহজেই বিতাড়িত করতে সক্ষম হয় মুঘল বাহিনী। 

১৬৬৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে চট্টগ্রাম সম্পূর্ণ দখলে নেয় মুঘলরা। তারা চট্টগ্রামের নাম রাখেন ইসলামাবাদ। উমেদ খানকে ইসলামাবাদের প্রথম ফৌজদার হিসেবে মনোনীত করা হয়।

পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব যুদ্ধে বিজয়ের স্মারক হিসেবে পাহাড়ের চূড়ায় একটি মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন বুজুর্গ উমেদ খানকে। সেই নির্দেশ মোতাবেক ১৬৬৭ সালে নির্মিত হয় আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ।      

আন্দরকিল্লার স্থাপত্যশৈলী

আন্দরকিল্লার মুল নকশা দিল্লির জামে মসজিদের মতো।  ভূমি থেকে ৩০ ফুট উচ্চতায় একটি পাহাড়ের ওপর মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদটির মোট আয়তন ২ দশমিক ৪২ একর। এটির চারপাশের দেয়াল আড়াই গজ প্রস্থ বিশিষ্ট। মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়াল নান্দনিক টেরাকোটা সমৃদ্ধ। অন্য তিন দিকের দেয়ালগুলো পাথরের তৈরি। মসজিদটির ছাদে তিনটি গম্বুজ মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 

মসজিদ দখল ও পুনরুদ্ধারের ইতিহাস

বৃটিশ শাসনামলে মসজিদটিকে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা মসজিদটির গম্বুজ ও কয়েকটি পিলার ভেঙে ফেলে। ১৭৬১ সাল থেকে ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯৪ বছর তারা এই মসজিদে কোনো ধরনের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতে দেয়নি।

পরবর্তীতে এর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন তৎকালীন বৃটিশ রাজের অধীনস্ত রাজস্ব কর্মকর্তা খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খান। তার এই আন্দোলনের মুখে ১৮৫৬ সালে মসজিদটি পুনরায় চালু হয়।  

প্রয়োজন সংরক্ষণের

এমন একটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মসজিদটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বলিষ্ঠ পদক্ষেপের প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরের সাবেক কিউরেটর শামসুল হোসেন বলেন, "আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হলেও মসজিদটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় আমরা অমূল্য এক সম্পদ হারাবো।"

পুরাতত্ত্ব বিভাগে আঞ্চলিক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "চট্টগ্রামের প্রাচীন অবকাঠামোগুলোকে চিহ্নিত করতে জরিপ চালানো হচ্ছে। এটি শেষ হলেও চিহ্নিত ভবনগুলোকে সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।"

উল্লেখ্য, মসজিদ কমিটির দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। জুম্মার দিন এই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৮ হাজারে। বর্তমানে মসজিদ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।