• শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৭ রাত

গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগ, যা বলছেন শিক্ষার্থীরা

  • প্রকাশিত ১০:০৯ রাত সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯
গোপালগঞ্জ
উপাচার্যের পদত্যাগের খবর ক্যাম্পাসে পৌঁছালে নেচে-গেয়ে, রঙ মেখে উল্লাস প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা ট্রিবিউন

‘ভিসির পদত্যাগের চিঠি শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছানোর পর আমাদের আন্দোলন কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে’

গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের টানা ১২ দিনের আন্দোলনের মুখেপদত্যাগ করেছেন উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. নাসিরউদ্দিন খোন্দকার। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপাচার্য পদত্যাগপত্র জমা দেন। 

এদিকে ভিসির পদত্যাগের খবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আনন্দের বন্যা বইছে। সময়ের যতো বাড়ছে, দূর-দূরান্তে থাকা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ক্যাম্পাসে ততই বাড়ছে। এ সময় তারা নেচে-গেয়ে, রং মেয়ে উল্লাস প্রকাশ করছে।জানা গেছে, সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপাচার্যের পদত্যাগের খবর ক্যাম্পাসে পৌঁছায়। ওই খবর পাওয়ামাত্র শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচী ছেড়ে আনন্দ-উল্লাস শুরু করে। রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের উল্লাস চলছিল। 

উপাচার্যের পদত্যাগের বিষয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভিসির পদত্যাগের খবর পেয়ে তারা ক্যাম্পাসে আনন্দ প্রকাশ করছেন। তবে তাদের কাছে এ সংক্রান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো চিঠি এসে পৌঁছায়নি। তেমন চিঠি পেলেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেবেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুল ইসলাম বলেন, “ভিসির পদত্যাগের চিঠি শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছানোর পর আমাদের আন্দোলন কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। ভিসির পদত্যাগে আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের জয় হয়েছে। আমরা অত্যাচার, নির্যাতন, অতিরিক্ত ফি থেকে মুক্তি পাবো। বিএনপিপন্থী এ ভিসি পদত্যাগ করায় বঙ্গবন্ধুর পূর্ণভূমি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। এখন আমরা একজন পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দেখতে চাই।”

সুমি ইসলাম নামে অপর এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা টর্চার সেল থেকে মুক্তি পেলাম আর আমাদের অভিভাবকরা অপমানের হাত থেকে রক্ষা পেলেন। তার আচার-আচরণ ভিসি সুলভ ছিল না। আমরা এমন ভিসি আর চাই না।”


আরো পড়ুন - পদত্যাগ করলেন গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য


গত ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্রী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক ফাতেমা-তুজ জিনিয়াকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফেসবুকের ব্যক্তিগত প্রোফাইলে অবমাননাকর বক্তব্য শেয়ার দেওয়ার অভিযোগকে সামনে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনিয়াকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও বহিষ্কারের ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন উপাচার্য ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ১৮ সেপ্টেম্বর প্রশাসন জিনিয়ার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার নিতে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, নারী কেলেংকারি ইত্যাদি অভিযোগে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা ভিসি পতন আন্দোলন শুরু হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর উপাচার্যের সমর্থক বাহিনী হামলা চালালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এ ঘটনা তদন্তে ইউজিসি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

গত ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর ইউজিসির তদন্ত কমিটি গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। ড. মো. আলমগীরের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্যরা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন ও লিখিত বক্তব্য নেন। তদন্ত কমিটি ভিসি ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগেরও তদন্ত করেন।

পরে গত রবিবার (২৯ অক্টোবর) তদন্ত কমিটি ইউজিসির চেয়ারম্যানের কাছে এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এ প্রতিবেদনে ভিসিকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে ভিসির বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের সত্যতা পওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে রবিবার রাত ৯টায় অসুস্থতার কথা বলে ভিসি নাসিরুদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ বাংলো থেকে পুলিশ পাহারায় বের হয়ে যান। পরে ভিসি হিসেবে সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সভায় যোগ দেন নাসিরুদ্দিন খোন্দকার। ওই সভার পরই সন্ধ্যার দিকে তিনি পদত্যাগ করেন। 


আরো পড়ুন - গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন ভিসি স্বয়ং 


ময়মসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটেক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ড. নাসির উদ্দিন খোন্দকার ২০১৫ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। দুর্নীতি, নিয়োগ, ভর্তি বাণিজ্য, অনিয়ম, নারী কেলেংকারিসহ বিভিন্ন বিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রথম মেয়াদের ৪ বছর সম্পন্ন করেন। ২০১৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে ফের ভিসি পদে নিয়োগ পেয়ে যোগদান করে নাসিরুদ্দিন। ভিসির পাশাপাশি তিনি কম্পিউটার সইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান ও বঙ্গবন্ধু ইন্সটিটিউট অব লিবারেশন ওয়াবের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পেয়ে তিনি আরো আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। দুনীতি, অনিয়ম, কথায় কথায় শিক্ষার্থী বহিষ্কার, শিক্ষকদের ওপর মানসিক নির্যাতন, সিনিয়রদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের বিভাগীয় প্রধান করাসহ তার বিরুদ্ধে দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন শিক্ষার্থীদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ও আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করেই তিনি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।