• সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:২৭ দুপুর

চাকরি দিতে রাবি উপ-উপাচার্যের দর কষাকষির ফোনালাপ ফাঁস!

  • প্রকাশিত ০৬:২২ সন্ধ্যা অক্টোবর ১, ২০১৯
রাবি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া। ছবি: সংগৃহীত

উপ-উপাচার্য : ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম, আচ্ছা মা, একটা কথা বলতো, আমার খুব শুনতে ইচ্ছা যে, এখানে তোমরা কত টাকা দেওয়ার জন্য রেডি আছো?’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়ার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। যেখানে উপ-উপাচার্য সাদিয়া সম্বোধন করে একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলেন। মেয়েটির সঙ্গে চাকরির বিনিময়ে টাকা নিয়ে দর কষাকষি করতে শোনা গেছে উপ-উপাচার্যকে। তবে সেখানে টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

সোমবার  (৩০ অক্টোবর)  রাতে ফোনালাপের অডিও ঢাকা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে। পাঠকদের উদ্দেশ্যে ফোন-আলাপটি হুবহু তুলে ধরা হল-

উপ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়া : ‘হ্যা সাদিয়া, আমি প্রফেসর জাকারিয়া, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর।

নারীকণ্ঠ : “আসসালামু আলাইকুম স্যার।”

উপ-উপাচার্য : “ওয়ালাইকুম আসসালাম, আচ্ছা মা, একটা কথা বলতো, আমার খুব শুনতে ইচ্ছা যে, এখানে তোমরা কত টাকা দেওয়ার জন্য রেডি আছো?”

নারীকণ্ঠ :  “স্যার সত্যি কথা বলতে...।”

উপ-উপাচার্য: “না না, সত্যি কথাই তো বলবা। উপরে আল্লাহ তায়ালা, নিচে আমি।”

নারীকণ্ঠ: “অবশ্যই, অবশ্যই। স্যার, আপনি যেহেতু তার অবস্থা জানেন, আরেকটা বিষয় এখানে স্যার, সেটা হচ্ছে, আপনি হুদার... মানে, এমনিতে সে কতটা স্ট্রিক্ট..., আপনি বোধহয় এটাও জানেন স্যার, একটু রগচটা ছেলে।”

উপ-উপাচার্য : “আচ্ছা রাখো, এখান থেকে কথা বলা যাবে না।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপাচার্যের সঙ্গে ফোনালাপ করা ওই সাদিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চাকরিপ্রার্থী ছিলেন তার স্বামী ও আইন বিভাগের সাবেক (বিভাগের ৩৪ ব্যাচের) শিক্ষার্থী নুরুল হুদা। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে অনার্সে ৩.৬৫ ও মাস্টার্সে ৩.৬০ পান। আইন অনুষদে সেরা হওয়ায় ২০১৭ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক ও ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পান। নুরুল হুদার বাড়ি উপ-উপাচার্য চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়ার এলাকা লালমনিরহাটে।

রেকর্ডের বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়ার সাথে মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার ফোনটি রিসিভ হয়নি।

এদিকে নুরুল হুদার সাথে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “আপনারা সাংবাদিক অনেক কিছুই জানেন। আমার এই বিষয়ে কিছু বলার নেই।”

অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া এ বিষয়ে মঙ্গলবার তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, “নুরুল হুদা দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার ছাত্র জীবনের শুরু থেকে আমি স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে দেখভাল করছি। তার লেখাপড়ার চলমান রাখতে তাকে দুটি স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পারি নুরুল হুদা চাকরি পেতে অসাধু কিছু ব্যক্তির কবলে পড়ে আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে ইসলামী ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার একটি স্লিপও আমার নজরে আসে। স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে তার এহেন অসাধুকর্ম রোধে খোঁজ নেওয়ার জন্য তার স্ত্রীকে ফোন দিয়েছিলাম। কারণ হুদার স্ত্রীর বাড়ি সৈয়দপুরে। হুদার স্ত্রী সেসময় ব্যাংক লেনদেনের বিষয়টি স্বীকারও করে বিস্তারিত বলতে রাজি হয়নি।” ফাঁস হওয়ার অডিও এডিট করা হয়েছে বলেও দাবি করেন উপ-উপাচার্য জাকারিয়া।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ওই বিভাগে প্রভাষক পদে তিন জন শিক্ষকের নিয়োগ হয়েছে। যার বিজ্ঞপ্তি হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চে এবং ওই বছরের ১৩ নভেম্বর নিয়োগের ভাইবা অনুষ্ঠিত হয়। আর ১৭ নভেম্বর সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ অনুমোদিত হয়। এর পরদিন ১৮ নভেম্বর নিয়োগপ্রাপ্তরা বিভাগে যোগদান করেন। নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন- উপ-উপাচার্যের মেয়ের জামাই সাইমুন তুহিন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম ঠান্ডুর মেয়ে নূর নুসরাত সুলতানা। নুসরাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছে। অন্যজন হচ্ছেন রাবির আইন বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী বনশ্রী রানী। এই তিন জনের চেয়ে বেশি পয়েন্ট থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ পাননি মোহাম্মদ নূরুল হুদা।

৫ সদস্য বিশিষ্ট ওই নিয়োগ ভাইভা বোর্ডে সভাপতি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান। এছাড়া সিনেট সদস্য রুস্তম আলী, বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শাহাজান মণ্ডল এবং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল হান্নান ও উপ-উপাচার্য।

অধ্যাপক শাহাজাহান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ওই নিয়োগের ভাইভা হওয়ার দুই-একদিন আগ থেকে কয়েকজন শিক্ষক আমাকে সজাগ থাকতে বলেন। ওই নিয়োগে আর্থিক লেনদেন হতে পারে বলে তারা জানিয়েছিলেন।”

স্বর্ণপদক পাওয়া নূরুল হুদাকে কী কারণে বাদ দেওয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অনেকদিন আগের বিষয় তো, ভুলে গেছি।”

জানা গেছে, নূরুলহুদার নিয়োগ না হওয়ার বিষয়টি জানার পর ওই সময় কয়েকজন সিন্ডিকেট সদস্য নিয়োগপ্রাপ্তদের জীবনবৃত্তান্ত খোঁজ নিতে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রেজিস্ট্রার তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, “নূরুল হুদা নিয়োগ না পাওয়ায় আমরা বিস্মিত হই। পরে কয়েকজন সিন্ডিকেট সদস্য যে তিন জন শিক্ষক প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বিষয়ে তথ্য চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রেজিস্ট্রার জানান, ওই ফাইলগুলো ক্লোজ করা হয়েছে।”

এদিকে ৫৫ সেকেন্ডের ওই অডিও ফাঁস হওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। উপাচার্যের দেশবিরোধী বক্তব্য ও উপ-উপাচার্যের অডিও ফাঁস থেকে প্রমাণ হয় এরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যর্থ। এদের পদত্যাগের দাবি জানান তারা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক নেতা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, এখানে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তৈরি করা হয়। সেখানেও যদি নিয়োগ বাণিজ্য চলে, তবে এর চেয়ে লজ্জার কিছু হতে পারে না। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের ডাক্তার থেকে শুরু করে কয়েকটি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সেখানেও বিশাল অংকের দুর্নীতি হতে পারে। এছাড়া রাকসুর অর্থের কোনও হিসাব নেই। সার্বিকভাবে এরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ঘোলাটে পরিবেশ তৈরি করেছে। এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদে অতিদ্রুত সব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে যাবেন বলেও জানান তিনি।

রাকসু আন্দোলন মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, “বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন উপাচার্যদের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিল, তখন আমরা গর্ব করছিলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম করছে না। সম্প্রতি উপাচার্যের বক্তব্য ও উপ-উপাচার্যের ফোনালাপ থেকে এটি প্রমাণিত, তারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের পদত্যাগের দাবিতে আজ (১ অক্টোবর) থেকে আন্দোলনে যাবো। সন্ধ্যায় মশাল মিছিল হবে।”

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে বিকেলে প্রগতিশীল ছাত্রজোট জরুরি মিটিং ডেকেছে বলে জানিয়েছেন জোটের সাবেক সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর শাখা সাধারণ সম্পাদক রঞ্জু হাসান।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক সানিন চৌধুরী বলেন, “বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যারা দুর্নীতি ও লুটপাটের মধ্যে ডুবে আছে। এরা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে। যার প্রমাণ চৌধুরী মো. জাকারিয়ার অডিও ফাঁস। আমরা মনে করি উপ-উপাচার্যের মতো পদে থাকার নৈতিকভাবে কোনও অধিকার নেই তার। যতদ্রুত সম্ভব তার পদত্যাগের দাবি করছি।”

তবে এ বিষয়ে অবগত নয় বলে জানান শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ফারুকী বলেন, “অডিওটি আমি এখনও শুনিনি। তবে এ ধরনের ঘটনা যদি ঘটে থাকে তবে নিন্দনীয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্তা ব্যক্তিরা যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তবে আমরা ছাত্রদের কী নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেবো।”

তিনি আরও বলেন, “এ ঘটনার পর উপ-উপাচার্য পদে থাকার নৈতিকতা নেই তার। আমি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, এ ধরনের ব্যক্তিকে প্রশাসনের উচ্চ পদে কী করে বসান?”