• সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৩ রাত

টাঙ্গাইলে ঝরে পড়া রোধে শিশু শিক্ষার্থীদের ‘রাতের পাঠশালা’

  • প্রকাশিত ০৭:৪৪ রাত অক্টোবর ৪, ২০১৯
টাঙ্গাইল
স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতেই চলছে স্কুলটি। ঢাকা ট্রিবিউন

প্রতিদিন সন্ধ্যায় শিশুরা আসে অবৈতনিক স্কুলে। বাবা-মায়ের যেমন করে সন্তানকে পড়ানোর কথা, ঠিক ওই দায়িত্বটি পালন করছে স্থানীয় যুবকেরা

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে গ্রামের দরিদ্র অসহায় শিশুদের জন্য শিক্ষিত যুবকরা চালু করেছে অবৈতনিক নৈশবিদ্যালয়। রাত্রি, কণা, রুমানা ও সাবিয়া প্রায়ই সমবয়সী, ওদের মতো আরও প্রায় ৭০ জন শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে ওই নৈশবিদ্যালয়ে। অবশ্য এদের প্রায় প্রত্যেককেই স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে। তবে অধিকাংশের অভিভাবকই সন্তানদেরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না, পারে না স্কুল থেকে দেওয়া বাড়ির কাজগুলো করে দিতে। ফলে কোনো কোনো শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষেই ঝড়ে পড়ে। ঝরে পড়া রোধে এসব শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় যুব সমাজ। 

উপজেলার আটিয়া শাহানশাহ্ আদম কাস্মিরী মাজারের পাশেই করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত এটি ‘রাতের পাঠশালা’। রাতে পড়ানোর ফলে শিশুদের স্কুলে যেতেও সমস্যা হচ্ছে না, স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদেরও ক্লাস নিতে সমস্যা হচ্ছে না। উপকৃত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা।

সন্ধ্যায় বাড়িতে শিশুদের পড়ার টেবিলে থাকার কথা। পরের ক্লাসের জন্য বাড়ির কাজগুলো শেষ করে দেওয়া অভিভাবকদের দায়িত্ব। কর্মজীবি অভিভাবকদের সময় না পাওয়া এবং বর্তমান পাঠ্য বই সম্পর্কে ধারণা কম থাকায় অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের পড়াতে পারে না। অনেক অভিভাবক আবার নিজেরাও লেখাপড়া জানেন না। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যায় শিশুরা আসে অবৈতনিক স্কুলে। বাবা-মায়ের যেমন করে সন্তানকে পড়ানোর কথা, ঠিক ওই দায়িত্বটি পালন করছে স্থানীয় যুবকেরা। যেন ওরাই শিশুদের অভিভাবক। প্রতিদিনের ক্লাসের পড়া আগের দিন সন্ধ্যায় প্রস্তুত করে দিচ্ছে কর্তব্যরত শিক্ষকরা। ছোটদের জন্য বড়দের এমন ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টায় শিশুদের উপকারের পাশাপাশি বিষয়টি স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। 


আরো পড়ুন - ১২১ বছর বয়স, তবুও মেলেনি বয়স্ক ভাতা!


গত বছরের ২৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। তখন কোনো নাম ছিল না এর। ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর আটিয়া গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান পাক বাহিনীর গুলিতে শহিদ হন। তাই বর্তমানে এ বিদ্যালয়টির নাম দেওয়া হয়েছে শহিদ মিজানুর রহমান অবৈতনিক নৈশ বিদ্যালয়। 

প্রথম পর্যায়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হলেও কিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলছে। হতদরিদ্রদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষা সামগ্রী। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ওবায়দুল ইসলাম, সুজন, পিয়ার আলী, আসিফ ও জাহিদ খান মসলিজ মুকুল ৫ জন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক কাজ করছেন। বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক পুলিশ সুপার ও আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা বীরমুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান শরিফ। 

কার্যক্রম শুরুর কিছুদিন পরই টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। পরির্শনকালে জেলা প্রশাসক যুবকদের ব্যতিক্রমী এই উদ্যেগে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। পরে প্রতিষ্ঠানের জন্য তাৎক্ষণিক দুই টন চাল বরাদ্ধ দেন।

কথা হয় বিদ্যালয়টির এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে, “আমরা খুশি। অনেক শিক্ষার্থীই এখানে এসে পড়ছেন। আমরা এখানে এসে অনেক কিছু শিখছি।”  

স্থানীয়রা জানান, শিশুদের ঘিরে এমন সেবা বিরল। এতে শিশুরা পড়ালেখায় সক্রিয় হচ্ছে। ঝরেপড়া রোধ হচ্ছে।


আরো পড়ুন - অস্তিত্ব সংকটে খরস্রোতা ধলেশ্বরী


স্থানীয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এসএম শফিউল্লাহ ফোরকান বলেন, “অনেক অভিভাবক আছেন যারা সন্তানদের সময় দিতে পারে না। পড়া বুঝিয়ে দিতে পারে না। এমন শিশুদের পাশে দাঁড়ানোটা অবশ্যই প্রসংশনীয়।”

প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পরিষদের যুগ্ম-সম্পাদক জাহিদ হাসান মজলিস মুকুল বলেন, “শিক্ষার মান বাড়াতে ও ঝরেপড়া রোধ করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছি আমি এবং আমার সহকর্মীরা। তবে ভাড়া জায়গায় অনেক সমস্যা রয়েছে। তাই একটি স্থায়ী জায়গার কথা ভাবছি আমরা।”

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দপ্তর সম্পাদক মীর শাফায়েত হোসেন শিপলু ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বর্তমানে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে আরও ভালোভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। বিদ্যালয়ের কার্যক্রম অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে রাতে চালানো হচ্ছে। পাশেই সরকারি খাসজমি রয়েছে। সরকারিভাবে বিদ্যালয়ের নামে উক্ত জমি বরাদ্ধ ও ঘর তৈরি করে দেওয়া হলে গ্রামের দরিদ্র অসহায় ছেলে মেয়েরা এখানে পড়াশোনা করে ভাল ফল করতে পারবে।” 

তিনি আরো বলেন, “আমরা কয়েকজন বন্ধু আড্ডা দেওয়ার অবস্থায় আমাদের মাথায় এ ধরনের চিন্তা আসে। সেই চিন্তা থেকেই আমরা এ ধরনের কার্যক্রম করছি। সামনে আমাদের বয়ষ্কদের নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম করানোর চিন্তা রয়েছে।”

দেলদুয়ার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান মারুফ বলেন, “আটিয়া গ্রামে তরুণদের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আমি তাদের স্কুলটি পরিদর্শন করেছি। উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে স্কুলটিকে সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।”


আরো পড়ুন - অবশেষে বয়স্ক ভাতা পেলেন শতবর্ষী বাছিরন বেওয়া