• রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৮ রাত

খুলনার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ

  • প্রকাশিত ১১:২৫ সকাল অক্টোবর ১১, ২০১৯
গণপিটুনি
প্রতীকী ছবি।

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর কুয়েটে নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন

খুলনার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসে রাতের আঁধারে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্যাতনের পর শিবির কর্মী ও নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে পুলিশে সোপর্দ করা হতো বলেও জানা গেছে। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হল থেকে রাতে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ছাত্রাবাসে মাদক সেবন, খাবারের নিম্নমান ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তারা মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ২১ শিক্ষার্থী পিটুনি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শিক্ষক ও অভিভাবকদের পরামর্শে ‘ঝামেলায় না জড়াতে’ ভুক্তভোগীরা ঘটনা চেপে যেতে বাধ্য হন। তবে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের নির্যাতনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর কুয়েটে নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ফজলুল হক হল, খান জাহান আলী হল, ড. এম এ রশিদ হল, লালন শাহ হল, রোকেয়া হল, অমর একুশে হল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রায় আড়াই হাজার সিটের নিয়ন্ত্রণ সরকার সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের নেতাদের হাতে। 

এসব হলে মাদক সেবন, খাবারের নিম্নমান ও চলমান বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানালে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা তাদেরকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করতেন। চলতি বছরের ২৪ মার্চ রাতে কুয়েটের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও বিভিন্ন হল থেকে তিন ছাত্রকে মারপিটের পর পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ওই ঘটনার ভুক্তভোগী ছিলেন মাহাদী হাসান, রেজাউল ও শাহীন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইএম বিভাগের ২০১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী। পরদিন পুলিশ তাদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি করে। ওই তিন ছাত্রকে বহিষ্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর (উপাচার্য) বরাবর স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছিল। 

ভুক্তভোগী মাহাদী হাসান বলেন, তাদের তিনজনের কেউই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নন। ক্যাম্পাসে মাদক, জুনিয়রদের র‌্যাগিং ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তারা ছাত্রলীগের রোষানলে পড়েন।

গতবছরের ২৯ জানুয়ারি কুয়েটের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হল থেকে মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, মাহাদী হাসান, মো. পারভেজ ও নাজমুল কবীরকে প্রহারের পর নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে খানজাহান আলী থানায় দুইটি মামলাও করা হয়। 

২০১৭ সালের পহেলা মে রাতে কুয়েটের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হলে শিবির সন্দেহে ১৪ শিক্ষার্থীকে আটকের পর বেধড়ক মারধর করা হয়। সেদিন মারধরের শিকার হন- আবদুল্লাহ নাইম, রুম্মান বিন জাহিদ, শহিদুল ইসলাম, রেজাউল্লাহ, মনিউল আলিফিন, আব্দুল আলিম, আব্দুল্লাহ আরমান, নাসির উদ্দিন, মোজাহের উদ্দিন, আবদুল্লাহ আরাফাত, লুৎফর রহমান, মাহিদি হাসান, শাহিনুজ্জামান ও মইন ইসলাম। ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পরদিন সকালে তাদের পুলিশে সোপর্দ করা হয়। নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে একটি মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখিয়েছিল পুলিশ। 

এবিষয়ে কুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন হাসান জানান, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া কোনো সংগঠনেরই দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। তবে ৭টি হলের কোনোটিতেই ছাত্রলীগের কমিটি নেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।

শিক্ষার্থীদের মারধর ও পুলিশে সোপর্দ সম্পর্কে তিনি বলেন, “প্রত্যেকটি ঘটনা সম্পর্কেই কুয়েট ছাত্র কল্যাণ পরিষদ নেতারা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক জানেন। ছাত্রলীগের দ্বারা কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। নাশকতার পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় তাদেরকে পুলিশে দেওয়া হয়েছে।”

হলে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে কুয়েট ভিসি প্রফেসর ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে হলগুলোর পরিবেশ এখন অনেক ভালো।

এদিকে, সরকারি বিএল কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েতুল্লাহ দিপুর অভিযোগ, কলেজের সুবোধ চন্দ্র হল, নজরুল হল, ড. জোহা হল এবং শহীদ তিতুমীর হল থেকে ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাতে ছাত্রদলের কর্মীদের মারধরের পর বের করে দেওয়া হয়। কলেজে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সহায়তায় নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসে।

শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রিয়াজ শাহেদ বলেন, ‘‘কলেজে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মিছিল-মিটিং করতে দেওয়া হয় না। অন্য কারও কথা বলার অধিকারও নেই।’ ’

তবে বিএল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নিশাত ফেরদৌস অনি বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালীরা হলে এসে মাদক সেবন করে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হলে তারাই ব্যবস্থা নেন। ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত নির্বাচনের পর ছাত্রদল নেতারা ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন। আর তাদেরকে দেখা যায়নি।

নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজের (খুমেক) ছাত্রাবাসেও। ২০১২ সালে এক শিক্ষার্থীকে হলের ভেতরে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো হয়েছিল।

খুমেক ছাত্রলীগের সভাপতি ডা. আসানুর ইসলাম বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ এবং ইচিপ (ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ)-এর কার্যক্রম আছে। সব হলগুলোতে আমাদের আদর্শের ছাত্ররাই থাকেন। 

খুলনার আরেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আযম খান সরকারি কমার্স কলেজে ছাত্রলীগের মিটিং-মিছিলে নিয়মিত অংশ নিলেই কেবল হলে আসন পাওয়া যায়। এছাড়া, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের তিনটি ছাত্রীনিবাসে র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ আছে।

শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে সরকারি মুহসিন কলেজেও। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর দুপুরে অর্থনীতি বিভাগের শেষবর্ষের ছাত্র মো. আলমগীর হোসেনকে মারপিট করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। ছাত্রলীগ নেতা রওশন আনিজি অন্তু ও সাজ্জাদের দাবি, আলমগীর শিবিরের রাজনীতিতে জড়িত।

এ বিষয়ে খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, কুয়েট থেকে বিভিন্ন সময় নাশকতার অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলাগুলো তদন্তকালে আটকদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ ও শিবিরের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। তদন্তকালে ভুক্তভোগীরা কেউই নির্যাতনের অভিযোগ করেননি। আর পুলিশও তদন্তে তাদের ওপর নির্যাতনের কোনো প্রমাণ পায়নি।