• রবিবার, জুলাই ১২, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:২৭ রাত

বঙ্গোপসাগরে বেপরোয়া ভারতীয় জেলেরা, ৬ বছরে আটক সহস্রাধিক

  • প্রকাশিত ০৮:৫২ সকাল অক্টোবর ১৬, ২০১৯
বঙ্গোপসাগর
ফাইল ছবি

বাংলাদেশি জেলেরা একাধিকবার তাদের হামলার শিকার হয়েছেন

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ কমছে না। কড়া নজরদারির মধ্যেও ভারতীয় জেলেরা সাগরের বাংলাদেশ অংশের মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এদেশের জেলেরা। 

গত ৬ বছরে বাংলাদেশের সীমায় প্রবেশ, ও মাছ শিকারের চেষ্টাকালে ১ হাজার ৩৫ জন ভারতীয় জেলে গ্রেফতার হয়েছেন। এরমধ্যে ২০১৫ সাল থেকে পর্যন্ত ৩৩২ জন ভারতীয় জেলেকে বাগেরহাট কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ৪৯ জন বাগেরহাট কারাগারে বন্দি রয়েছেন। অন্যরা বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্তি পেয়ে ভারতে ফিরে গেছেন। গত ১, ৪ ও ১৩ অক্টোবরেও সুন্দরবন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় আলাদাভাবে চারটি ট্রলারসহ এ ৪৯ জন ভারতীয় জেলে গ্রেফতার হয়।

উপকূলীয় এলাকার জেলেরা জানান, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রায়ই তারা ভারতীয় জেলেদের মুখোমুখি হন। প্রতিবাদ করলে সংঘবদ্ধ আক্রমণের মুখে পড়েন। বাংলাদেশি জেলেরা একাধিকবার তাদের হামলার শিকার হয়েছেন। 

জেলেরা আরও জানান, ভারতীয় জেলেদের মাছ ধরার ট্রলারগুলো বেশ বড়। লোকজনও বেশি থাকে। রাতের আঁধারে তারা সীমানায় ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যায়।

উপকূলীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি শেখ ইদ্রিস আলী বলেন, ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে মাছ শিকার করে বেশি। মাঝে মাঝে থাইল্যান্ডের জেলেরাও আসে। ইলিশ ধরা মৌসুমে এদের যাতায়াত বেড়ে যায়।

জেলেরা বলেন, ভারতে পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০ জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। আর বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা থাকে ৬ জ্যৈষ্ঠ থেকে ১০ শ্রাবণ পর্যন্ত। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ সময়ের সুযোগ নিয়ে ভারতীয় জেলেরা এপার থেকে মাছ ধরে নিয়ে যায়।

ট্রলার মালিক জলিল শেখ বলেন, ভারতীয় জেলেদের কাছে বড় বড় ট্রলার ও আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকে। কোন এলাকায় বেশি মাছ আছে তারা তা যন্ত্র দিয়ে শনাক্ত করতে পারে। তখন সংঘবদ্ধভাবে একাধিক ট্রলার নিয়ে মাছ আহরণ শুরু করে। তারা ওই স্থান থেকে বাংলাদেশি জেলেদের সরে যেতে বলে। তাদের মাছ ধরার জালের কারণে বঙ্গোপসাগরের এ অংশে অনেক প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকার যখন মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে, তখন ভারতীয় জেলেরা ইচ্ছামতো মাছ আহরণ করে।

মোংলার মৎস্য ব্যবসায়ী রবিউল, আল আমিন ও জসিম অভিযোগ করে জানান, ভারতীয় জেলেদের উৎপাতে দেশি জেলেদের বর্তমান ইলিশ মৌসুমে মাছ শিকার ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একসময় ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় ঘেঁষে বা কিছুটা ভিতরে ঢুকে ইলিশ শিকার করতো। বর্তমানে উপকুলীয় এলাকার কাছাকাছি এসে অবাধে মাছ শিকার করছে। অধিকাংশ সময়ই তারা গোপনে মাছ শিকার করে চলে যায়। বিদেশি জেলেরা উচ্চতাসম্পন্ন বাইনোকুলার দিয়ে ট্রলারে বসে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তৎপরতায় চোখ রাখে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের জলসীমা থেকে ভারতের কাকদ্বীপ এলাকার কাছে হওয়ায় সেখানকার বিপুল সংখ্যক জেলে এদেশের জলসীমায় মাছ ধরতে আসে। প্রতি বছর অক্টোবর-নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশি জেলেরা বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় ট্রলার ও নৌকায় করে সামুদ্রিক নানা ধরনের মাছ আহরণ করে থাকেন। সমুদ্র শান্ত থাকায় এ সময়টা জেলেদের মাছ আহরণের উপযুক্ত মৌসুম।

দেশীয় জলসীমায় সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বেশি তাই এ সময়টাই মাছ লুণ্ঠনের টার্গেট থাকে ভীনদেশি জেলেদের। আর সেই সুযোগ বুঝোই প্রতিবেশী দেশ ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের জেলেরা অত্যাধুনিক ট্রলার মাছ ধরার উপকরণ নিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় অনুপ্রবেশ করে মাছ শিকার করে। তারা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বাইনোকুলার দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তৎপরতায় চোখ রাখে এবং নৌবাহিনী আসতে দেখলেই দ্রুত পালিয়ে যায়।

কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের (মোংলা সদর দপ্তর) অপারেশন কর্তকর্তা লেফটেন্যান্ট ইমতিয়াজ আলম জানান, "দেশীয় জেলেরা সমুদ্রের ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে মাছ ধরতে পারে। আর ভারতীয় জেলেরা দেশীয় সমুদ্রসীমার প্রায় ১৫০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে থাকে। তারা দ্রুতগামী নৌযান ও কারেন্ট জালসহ  জিপিএস ব্যবহার করে। এসব জেলেদের ধরতে নৌবাহিনীর পাশাপাশি তারাও সাগরে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।"

মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, সমুদ্রসীমা লংঘনের অভিযোগে সম্প্রতি গ্রেফতার ৪৯ জেলের সবাই ভারতীয় নাগরিক। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর ১১ জেলেকে নৌবাহিনী আটক করে। এদের ১৪ অক্টোবর মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে বাগেরহাট জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এ জেলেরা হলেন- সিদ্ধিশ্বর গানা (৫৪),  শ্রীকৃষ্ণ (৫৩), দিপক বাড়ই (৩৫), রামকৃষ্ণ দাস (৩০), হরিপ্রধান (৫৭), সুভাষ পাল (৫২), মাইনু হানবেগ (৫৮), পিন্টু মণ্ডল (৪৮), জন্টু মৃধা (৫৫), প্রদীপ পাল (৩৫) ও গোকুল দলপতি (৩৭)। 

বঙ্গোপসাগরে আটক দুটি ভারতীয় ফিশিং ট্রলার। ঢাকা ট্রিবিউন ওসি আরও জানান, এর আগে ৪ অক্টোবর বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অনুপ্রবেশ করে মাছ শিকারের অপরাধে এফবি স্বর্ণদ্বীপ ও এফবি অমৃত নামের দুটি ফিশিং ট্রলারসহ ২৩ জন ভারতীয় জেলেকে আটক করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা। তারা হলেন- হরিরঞ্জন, শুকুমার দাস, শ্রীমন্ত দাস, নিরোদ দাস, বিশ্বজিৎ সাহা, অনীল পুরকাইত, গুরুপদ জানা, তপন পুরকাইত, বিজয় দাস, নিরঞ্জন দাস, প্রণব মণ্ডল, আপান্না, কালিপদ সামন্ত, কার্তিক জেনা, দুদ কুমার ভূঁইয়া, অভি, পাওলিয়া, নারী সাম্মা, দানিয়া, রামু, রাম ও আপ্পানা। এসব জেলেদের বাড়ি ভারতের চব্বিশ পরগনা ও বিজয়নগর এলাকায়। 

এর আগে গত ১ অক্টোবর একইভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে মাছ শিকারের সময় ভারতীয় এফবি মা লক্ষী নামের একটি ফিশিং ট্রলারসহ ১৫ জন ভারতীয় জেলেকে আটক করা হয়। আটকরা সবাই ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর ২২ ধারায় মামলা দায়ের শেষে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৫ অক্টোবর বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের সীমায় একটি ফিশিং বোটসহ ভারতীয় ১৩ জেলেকে গ্রেফতার করে নৌবাহিনী। ওই বছরের ১৬, ১৯, ২১ ও ২৩ অক্টোবর এ এলাকায় আলাদা অভিযানে আরও চারটি ফিশিং বোটসহ ৫৫ ভারতীয় জেলে গ্রেফতার হয়। পরে ২৭ অক্টোবর ট্রলারসহ নয় ভারতীয় জেলেকে গ্রেফতার করে নৌবাহিনী। এছাড়া ৩১ অক্টোবর দুটি ট্রলারসহ ভারতের ২৮ জেলেকে গ্রেফতার করা হয়। 

২০১৫ সালের ৭ অক্টোবর আটটি ট্রলারসহ ১০৪ জন ভারতীয় জেলেকে গ্রেফতার করে নৌবাহিনী। ওই বছরের ৫ অক্টোবর একই এলাকা থেকে পাঁচটি ট্রলারসহ ৬১ জন ভারতীয় জেলেকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ২৭ ভারতীয় জেলেকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ৪ ফেব্রুয়ারি এ এলাকা থেকে তিনটি ট্রলারসহ ৩৪ ভারতীয় জেলেকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ৪ আগস্ট তিনটি ফিশিং ট্রলারসহ ৪২ ভারতীয় জেলে গ্রেফতার হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর পাঁচটি ফিশিং ট্রলারসহ ৬১ জন ভারতীয় জেলেকে গ্রেফতার করা হয়। 

২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগর থেকে ট্রলারসহ ১০ ভারতীয় জেলে গ্রেফতার হয়। ২০১৯ সালের ৭ জুলাই চালিতাবুনিয়া ও মৌডুবি এলাকা থেকে ৩২টি ভারতীয় ট্রলারসহ পশ্চিমবঙ্গের ৫৪২ জেলেকে গ্রেফতার করা হয়।

55
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail