• সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৩ দুপুর

ছাত্রলীগ ও ছাত্র কল্যাণ পরিষদকে দুষলেন বুয়েট ভিসি

  • প্রকাশিত ০৯:৪০ রাত অক্টোবর ২৪, ২০১৯
বুয়েট উপাচার্য
বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। রাজিব ধর/ঢাকা ট্রিবিউন

সম্প্রতি ঢাকা ট্রিবিউনের মিজানুর রহমান ও ফাহিম রেজা শোভনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে কথা বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছাত্রলীগের বিতর্কিত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকে সামনে তুলে এনেছে। এই হত্যাকাণ্ডের অনেক আগে থেকেই বুয়েটের হলগুলোতে র‍্যাগিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করার অভিযোগ ছিল ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।

আগে ভয়ে মুখ না খুললেও আবরার হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলে এই ধরনের নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনার কথা জানাতে শুরু করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এতে সারাদেশে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে।

সম্প্রতি ঢাকা ট্রিবিউনের মিজানুর রহমান ও ফাহিম রেজা শোভনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব বিষয়ে কথা বলেন বুয়েটের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারে বুয়েটে এমন পরিস্থিতির জন্য ছাত্র কল্যাণ পরিষদের (ডিএসডাব্লিউ) পরিচালককে দোষারোপ করলেন তিনি। এমনকি, একবার নিজেদের পছন্দের লোক না হওয়ায় বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের পরিচালক বদলাতে প্রশাসনকে বাধ্য করেন বলেও অভিযোগ করেন বুয়েটের উপাচার্য। এছাড়াও আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দায় তার নয় বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে ভিসির একার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু দেখভাল করা সম্ভব নয়।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগ বুয়েট ক্যাম্পাসে এমন ত্রাসের রাজত্ব কিভাবে কায়েম করলো?

ড. সাইফুল: এটা ছাত্র কল্যাণ পরিষদের দেখার বিষয়। এই দায় আমার নয়।

ঢাকা ট্রিবিউন: উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের নির্যাতনের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত থাকা কি আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, যেখানে শিক্ষার্থীদের সবাই এ সম্পর্কে জানেন?

ড. সাইফুল: র‍্যাগিং কম বেশি আগেও ছিল। ২০০৮-০৯ সেশন থেকে ধীরে ধীরে এটা বেড়েছে। কিন্তু মারাত্মক আকার ধারণ করার বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি গত জুনে। এই বিষয়ে উপার্চায সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। এসব বিষয় দেখাশোনার দায়িত্ব ছাত্র কল্যাণ পরিষদ পরিচালকের।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি বলছেন এগুলো দেখার কথা ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালকের। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই পদটিতে নিয়োগ নিয়ে বরাবরই জলঘোলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন বারবার ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালককে পরিবর্তন করছে?

ড. সাইফুল: আমি উপাচার্য হিসেবে যোগদানের আগে থেকেই ক্যাম্পাসে র‍্যাগিংয়ের প্রচলন ছিল। এর আগে ছাত্রকল্যাণ পরিষদ পরিচালক হিসেবে অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অত্যধিক কাজের চাপ এবং ‘স্বাস্থ্যগত কারণ’ দেখিয়ে তিনি অবসরে গেছেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদারকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনি হলগুলোতে র‍্যাগিং থামাতে পারেননি। অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার সম্ভবত "অত্যাধিক নমনীয় ছিলেন" বলে এই চর্চা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

চলতি বছরের জুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পর্যালোচনা কমিটির সভায় র‍্যাগিংয়ের নামে শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিষয়ে জানতে পারি আমি।

কয়েকজন অভিভাবকও র‍্যাগিং নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। সভায় অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার উপস্থিত না থাকায়, আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন করে এসব বিষয়ের ব্যাপারে জানতে চাই। তিনি জবাব দেন, এসবের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।

পরে অন্য এক সভায় অধ্যাপক সত্য প্রসাদ ছাত্র কল্যাণ পরিষদ পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। পরবর্তীতে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিষদ পরিচালক পদে অধ্যাপক আবুল কাশেম মিয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে ছাত্রলীগের তীব্র বিরোধিতার কারণে অধ্যাপক আবুল কাশেম মিয়াকেও অবিলম্বে পদ ছাড়তে হয়। অধ্যাপক কাশেমের স্থলাভিষিক্ত হন অধ্যাপক মিজানুর রহমান। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর আমি দেখতে পেলাম যে, অধ্যাপক মিজানও ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। ছাত্র কল্যাণ পরিষদ যদি ঠিকভাবে কাজ করতো তাহলে এই ধরনের ঘটনা কখনই ঘটতো না।

ঢাকা ট্রিবিউন: ছাত্রলীগের পছন্দেই কেন ছাত্র কল্যাণ পরিষদ পরিচালককে নিয়োগ দেওয়া হয়? এতোটা ক্ষমতা তারা পায় কিভাবে?

ড. সাইফুল: এসবের জন্য ছাত্রদেরকে শিক্ষকরা (বুয়েট শিক্ষক সমিতির নেতারা) মদদ দেন।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে কখনো?

ড. সাইফুল: শৃংখলাভঙ্গের অভিযোগে এর আগে শুভ্র এবং কনক (বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) নামের দু'জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে, হাইকোর্টের আদেশে তারা বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করতে সক্ষম হয়।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি কি মনে করেন যে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে?

ড. সাইফুল: আমি আমার ক্ষমতাবলে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করেছি। কিন্তু আমিতো সরকারের উর্ধ্বে নই। আমার ক্ষমতা সরকারের বাইরে নয়। এরপরে কি হবে আমি জানি না। কিন্তু আমি আশা করি সরকার বিষয়টা বুঝতে পারবে।

আমি রাজনীতি বুঝতে চাই না। ব্যাক্তিগতভাবে আমি মনে করি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটা ঠিকই আছে। এখন শিক্ষকদের রাজনীতি যদি শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার প্রতিষ্ঠানে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার জন্য কি আপনি নিজেকে দায়ী মনে করেন?

ড. সাইফুল: এখানে আমার দোষ কোথায়? বরং আমি আমার অবস্থান থেকে পরস্থিতি সামলানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু শিক্ষক সমিতির নেতারা শিক্ষার্থীদের এখনও মদদ দিচ্ছেন আমাকে সরানোর জন্য।

এখানে যে ঘটনাটা ঘটেছে তার সাথে আমার পদত্যাগের কি সর্ম্পক? আমি পদত্যাগ করলে লাভ কি? আমার পরে যে দায়িত্বে আসবেন তিনি যে আমার থেকে চালাবেন তার কি গ্যারান্টি আছে? পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না।

আগের দুই ভিসির সময়ের তুলনায় আমি অনেক শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। শুধু এই দুইজনকে (বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। ওরা কাশেম মিয়াকে ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালকের পদ থেকে সরানোর জন্য পাঁচ দিন স্ট্রাইক করেছিল। পুরো বিশ্ববিদালয়ে তালা মেরে দিয়েছিল। সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের হাতে ছিল। তখন শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের সাহায্য নিয়ে আমাকে সে সমস্যার সমাধান করতে হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের র্অগানোগ্রাম রয়েছে। যার যার দায়িত্ব সে সে পালন করবে। আমিতো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি জায়গায় যেতে পারি না। আমাকে দায়ী করেতো লাভ নেই।