• সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:৪২ দুপুর

ঢাবি ছাত্র আবু বকর হত্যা: রায়ের ২২ মাস পর জানলো পরিবার!

  • প্রকাশিত ১২:০১ দুপুর অক্টোবর ২৭, ২০১৯
আবু বকর সিদ্দিক
নিহত আবু বকর সিদ্দিক। ফাইল ছবি

২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এএফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিক নিহত হওয়ার প্রায় ১০ বছর কেটে গেছে। তার হত্যাকাণ্ডের রায় ২০১৭ সালের ৭ মে নিম্ন আদালতে ঘোষিতও হয়েছে।

তবে, শুধু রায় ঘোষণাই শেষ কথা নয়। এখনও পর্যন্ত দোষীদের কেউ গ্রেফতার হয়নি, কোনও আবেদনও হয়নি নথিভুক্তি। এমনকী, আবু বকরের পরিবার মামলার রায়ের বিষয়েও অবগত ছিলেন না! আটমাস আগে একটি দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে সেসম্পর্কে জানতে পেরেছেন।

আবু বকর সিদ্দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এএফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। সেদিনই পুলিশ একটি মামলা দায়ের করে।

আবু বকর ওই সংঘর্ষের ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসিএইচ) মারা যান তিনি।

সেসময় আট ছাত্রলীগকর্মীকে এই ঘটনায় গ্রেফতার করা হলেও, আদালত আবু বকরের জখম ও পরবর্তীতে মৃত্যুতে আসলে কে জড়িত তা সনাক্ত করতে না পারায় তারা প্রত্যেকেই শেষপর্যন্ত খালাস পেয়ে যান।

ময়নাতদন্তে জানা গিয়েছিলো, আবু বকরের মাথার পেছনে ভোঁতা কোনও বস্তু দিয়ে অনেক জোরে আঘাত করা হয়েছে। পরবর্তীতে ঢাবি গঠিত তদন্ত কমিটি ও ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) জানিয়েছিলো, আবু বকরের মাথার আঘাতটি ছাত্রলীগের ছোঁড়া ইট-পাটকেল অথবা পুলিশের ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাস ক্যানিস্টারের আঘাতে হয়ে থাকতে পারে।

আবেদনের আকাংক্ষায় পরিবার

আবু বকরের বড় ভাই মোঃ আব্বাস আলির সাথে যোগাযোগ করা হলে জানান, তিনি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবিএম বশির উদ্দিনের সাথে মামলার অগ্রগতি নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন। 

আব্বাস আলি বলেন, “আমি আগে একাধিকবার বশির উদ্দিন সাহেবকে ফোন করেছি। তিনি কখনই আমাকে মামলার খবরা-খবর কিছু জানাননি। তিনি শুধু বলেছেন, ‘মামলা ঠিকমতই চলছে, খরচ-পাতি যা হচ্ছে সেগুলো পাঠান’।”

তবে তিনি বশির উদ্দিনকে কখনই কোনও টাকা-পয়সা পাঠাননি বলে জানান।

তিনি বলেন, “আমি ধরেই নিয়েছিলাম গণমাধ্যমে রায়ের বিষয়টি উঠে এলে প্রত্যেকেই জানবে আসলে কী ঘটেছে। আটমাস আগে পত্রিকা পড়ে জানতে পারলাম রায় ঘোষণা হয়ে গেছে। আমি কল্পনাও করতে পারছিলাম না যে প্রত্যেকে খালাস পেয়ে যাবে।” 

তবে, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে তিনি আরও আবেদন করতে চান বলে জানান।

পরবর্তীতে, ঢাকা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বশিরের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে জানা যায়, তিনি দুইবছর আগে মারা গেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার একেএম এহসানুর রহমান জানান, এটি সম্পূর্ণভাবে পাবলিক প্রসিকিউটরের দায়িত্ব মামলার বাদীপক্ষ, পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবারকে অবহিত করা।

তিনি বলেন, “বাদীপক্ষ যদি মামলার রায় সম্পর্কে না জানে এবং আবেদনের সময়সীমা পেরিয়ে যায়, তবে সেক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পুনঃআবেদন করা সম্ভব।” 

অন্যদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন দায়রা আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ মাহফুজুর রহমান চৌধুরী জানান, বাদীপক্ষকে মামলার রায় সম্পর্কে জানানোর বিষয়ে কোনও বাধ্য-বাধকতা নেই। একইসাথে, তিনি দাবি করেন, ভুক্তভোগী পরিবার মামলার ধারাবাহিকতা নজরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কেবল, বাদীপক্ষকে মামলার কাঠামো ও অভিযোগপত্র পেশ করার বিষয়ে জানানোটা বাধ্যতামূলক।   

একটি অসমাপ্ত তদন্ত

ঘটনার পরপরই ঢাবি প্রশাসন ৯ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে, পরবর্তীতে আবু বকরের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় ওই তদন্ত কমিটি।  

এরপর কমিটিটি অবশ্য অন্য একটি ‘উচ্চ-পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি’র মাধ্যমে তদন্তের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিলো।  

ঢাবি’র তদন্ত কমিটি প্রধান হারুন-অর-রাশিদ ও কমিটি’র আরেক সদস্য প্রফেসর রহমতুল্লাহর সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ঘটনাটি সুনির্দিষ্টভাবে তাদের স্মরণে নেই। 

প্রফেসর রহমতুল্লাহ বলেন, “আমি তিনবছর আগের ঘটনাই মনে করতে পারি না আর সেখানে ১০বছর আগে কী ঘটেছিলো কীভাবে মনে থাকবে। তাই কেবল ধারণা করে কোনও বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবো না।” 

আবু বকর সিদ্দিক নিহতের ঘটনায় সেসময় ঢাবি প্রশাসন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১০ ছাত্রকে বহিষ্কার করে। অন্যদিকে, সিআইডি তাদের প্রতিবেদনে ১৩ ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলো। 

তবে সকল অভিযুক্তই সঠিক তথ্য-প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যায়।

অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ মাহফুজুর রহমান চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউন’কে বলেন, “আসলে, আমাদের প্রত্যক্ষদর্শী প্রয়োজন। যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তারা বলেছেন, তার কেউ ঘটনা সম্পর্কে জানেন না। প্রত্যেকেই দাবি করেছেন, তারা শুধুই আহত আবু বকরকে উদ্ধার করেছেন।”